ফিডে প্রোডাক্টের ছবি কেন আর থামায় না

একটা দৃশ্য কল্পনা করুন। রাত এগারোটা, কেউ একজন বিছানায় শুয়ে বুড়ো আঙুল দিয়ে ফিড নামাচ্ছেন। প্রতিটা পোস্টে তিনি গড়ে এক সেকেন্ডেরও কম সময় দেন। ওই এক সেকেন্ডে তাঁর মাথা একটাই সিদ্ধান্ত নেয়: এটা কি বিজ্ঞাপন, নাকি মানুষের জিনিস।

!রিল স্টুডিওতে UGC বিজ্ঞাপন বানানোর প্রথম পর্দা

!উপস্থাপক বাছাই: নিজের ছবি, বা তৈরি ছয়জন

সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে বসানো প্রোডাক্টের ছবি, উপরে বড় করে লেখা ছাড়ের কথা, কোণায় একটা লাল স্টিকার। এই ছবিটা ওই সিদ্ধান্তে এক সেকেন্ডও নেয় না। মাথা বলে দেয়, বিজ্ঞাপন, আর আঙুল চলে যায়।

সমস্যাটা ছবির মান নয়। ছবিটা হয়তো খুব ভালো তোলা। সমস্যাটা হলো ছবিটা দেখতে বিজ্ঞাপনের মতো, আর মানুষ ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখতে আসেন না, মানুষ দেখতে আসেন।

তাই যে ভিডিওগুলো এখন কাজ করে, সেগুলোর চেহারা উল্টো: হাতে ধরা ফোনে তোলা, ঘরের আলোয়, একজন সাধারণ মানুষ কথা বলছেন। প্রথম দেড় সেকেন্ডে মাথা বলে, এটা মানুষের জিনিস, আর আঙুল থেমে যায়। থামলেই বাকি কথাগুলো বলার সুযোগ পাওয়া যায়।

UGC বিজ্ঞাপন মানে আসলে কী

UGC মানে user generated content, বাংলায় বললে ব্যবহারকারীর বানানো জিনিস। বিজ্ঞাপনের ভাষায় এর মানে দাঁড়ায়: এমন একটা ভিডিও যেটা দেখতে ব্র্যান্ডের বানানো বিজ্ঞাপনের মতো নয়, দেখতে একজন সাধারণ ক্রেতার নিজের ফোনে তোলা ভিডিওর মতো।

গঠনটা সহজ। একজন মানুষ, হাতে প্রোডাক্টটা, ঘরের বা দোকানের আলো, আর সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কয়েকটা কথা। কোনো স্টুডিও নেই, কোনো মিউজিক ভিডিওর মতো কাট নেই।

কেন এটা কাজ করে, তার কারণ তিনটা:

একটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার। UGC মানে ভুয়া রিভিউ নয়। যিনি বলছেন তিনি সত্যিই যদি ক্রেতা না হন, তাহলে "আমি ব্যবহার করেছি, দারুণ" এই কথাটা বলানো ঠকানো। এর বদলে প্রোডাক্টটা দেখানো, কী কাজে লাগে বলা আর দাম বলা, এতে কোনো সমস্যা নেই।

পনেরো সেকেন্ডের ভেতরটা যেভাবে ভাগ হয়

একটা কাজের ভিডিও এলোমেলো নয়, তার ভেতরে একটা গঠন আছে। পনেরো সেকেন্ডকে চার ভাগে ভাগ করে দেখুন:

সময়পর্দায় যা ঘটেকাজটা কী
শুরুর ৩ সেকেন্ডমুখ আর প্রোডাক্ট একসাথে, একটা প্রশ্ন বা সমস্যাআঙুল থামানো
পরের ৬ সেকেন্ডএকটাই কথা, প্রোডাক্টটা হাতে ঘুরিয়ে দেখানোবোঝানো
পরের ৩ সেকেন্ডদাম বা অফার, স্পষ্ট করেসিদ্ধান্ত করানো
শেষ ৩ সেকেন্ডএকটাই পরের পদক্ষেপকাজ করানো

চারটা ভাগের প্রতিটার একটাই দায়িত্ব। এক ভাগে দুটো কাজ করাতে গেলে দুটোই দুর্বল হয়।

দ্বিতীয় ভাগটার দিকে আলাদা করে তাকান, ওখানে লেখা আছে "একটাই কথা"। এটাই সবচেয়ে বেশি অমান্য করা নিয়ম। মানুষ এক ভিডিওতে সব ঢোকাতে চান: কাপড়ের মান, সেলাই, রং, দাম, ডেলিভারি, ফেরতের নিয়ম, দোকানের ঠিকানা। অথচ দর্শক পনেরো সেকেন্ডে একটার বেশি কথা মনে রাখেন না।

কোন কথাটা বাছবেন? নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, দোকানে এসে ক্রেতারা সবচেয়ে বেশি কোন প্রশ্নটা করেন। ওইটাই আপনার একটা কথা। কেউ যদি বারবার জিজ্ঞেস করেন "এটা ধুলে রং যাবে কি না", তাহলে পুরো ভিডিওটা ওই একটা প্রশ্নের উত্তর হোক। শেষের পদক্ষেপটাও একটাই রাখুন, ইনবক্সে মেসেজ, নয়তো কমেন্টে লেখা, নয়তো লিংকে চাপ দেওয়া। তিনটা পথ দেখালে মানুষ কোনোটাই ধরেন না।

প্রথম তিন সেকেন্ডই পুরো খেলাটা

বাকি বারো সেকেন্ড কতটা ভালো, সেটা কোনো ব্যাপারই না যদি প্রথম তিন সেকেন্ডে কেউ না থামে।

তিন সেকেন্ডে যা থাকা দরকার:

সবচেয়ে সাধারণ ভুলটা হলো ভূমিকা। মানুষ ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে আগে সালাম দেন, পরিচয় দেন, দোকানের নাম বলেন, তারপর আসল কথায় আসেন। ততক্ষণে সাত সেকেন্ড গেছে আর দর্শক নেই। পরিচয়টা দিন শেষে, যখন দর্শক আটকে গেছেন।

আরেকটা ছোট কৌশল। প্রথম ফ্রেমে হাতটা নড়ুক, প্রোডাক্টটা তুলে ধরা হোক বা বাক্স খোলা হোক। স্থির একটা মুখের চেয়ে নড়াচড়া আঙুল বেশি থামায়।

যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়

শেষ ভুলটা সবচেয়ে অবহেলিত। ফোনের ক্যামেরা এখন যথেষ্ট ভালো, কিন্তু ফোনের মাইক্রোফোন দূর থেকে ভালো শোনে না। দুই হাত দূরত্বে দাঁড়ান, আর ফ্যান বন্ধ রাখুন।

প্রোডাক্টের ছবিটা নিজের ফোনে যেভাবে তুলবেন

যেকোনো পথেই যান, একটা পরিষ্কার প্রোডাক্ট ছবি লাগবেই। ফোনেই ভালো ছবি ওঠে, শুধু কয়েকটা নিয়ম মানলে:

  1. জানালার আলোয় তুলুন, দুপুরের রোদে নয়। জানালার পাশে টেবিলে রেখে জানালার দিকে মুখ করে দাঁড়ান
  2. ফ্ল্যাশ বন্ধ। সরাসরি ফ্ল্যাশে প্রোডাক্টের রং বদলে যায় আর ছায়া কড়া হয়
  3. সাদা বা এক রঙের ব্যাকগ্রাউন্ড। একটা সাদা কাগজ বা এক রঙের কাপড়ই যথেষ্ট
  4. তিনটা কোণ থেকে তুলুন। সামনে, পাশে, আর একটা কাছ থেকে যেখানে সেলাই বা গায়ের লেখা পড়া যায়
  5. হাতের পাশে একটা ছবি রাখুন। এতে মাপটা বোঝা যায়, আর ফেরত আসা কমে
  6. ফোন স্থির রাখুন। দুই কনুই টেবিলে ঠেকিয়ে নিন, ট্রাইপড না থাকলেও চলবে

ছবিটা যত পরিষ্কার হবে, পরের ধাপটা তত সহজ হবে, সেটা আপনি নিজে শুট করুন বা অন্য কাউকে দিন।

স্ক্রিপ্টটা কত বড় হবে

পনেরো সেকেন্ডে বাংলায় সাধারণত ৩৫ থেকে ৪০টা শব্দ ধরে। এর বেশি লিখলে হয় তাড়াহুড়ো করে বলতে হবে, নয়তো ভিডিও লম্বা হয়ে যাবে।

চার লাইনের একটা ছাঁচ, যেটা প্রায় সব প্রোডাক্টে খাটে:

স্ক্রিপ্ট লেখার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো, লিখে ফেলার আগে একবার মুখে বলুন আর ফোনে রেকর্ড করে শুনুন। যেটা মুখে বলতে অস্বস্তি লাগে, সেটা ভিডিওতেও অস্বস্তিকর শোনাবে।

বানানোর তিনটা পথ

পথযা লাগেযেখানে আটকায়
নিজে শুট করাএকটা ফোন, আলো আর কিছুটা সময়ক্যামেরার সামনে কথা বলা
ক্রিয়েটরকে দিয়ে করানোবাজেট, সমন্বয় আর অপেক্ষাদর ঠিক করা আর বারবার বানানো
AI দিয়ে বানানোপ্রোডাক্টের ছবি আর স্ক্রিপ্টপর্দায় বাংলা লেখা

তিনটাই বৈধ পথ, আর তিনটার খরচ তিন রকম জিনিসে: প্রথমটায় আপনার সময়, দ্বিতীয়টায় টাকা, তৃতীয়টায় Token। নিচে তিনটাই আলাদা করে বলা হলো।

নিজে শুট করলে যা লাগে

সবচেয়ে সস্তা আর প্রায়ই সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য পথ, কারণ দোকানের মালিক নিজে বললে সেটা কেউ নকল করতে পারে না।

যা লাগে: একটা ফোন, জানালার আলো, আর একটা শান্ত ঘর। ট্রাইপড না থাকলে ফোনটা কোনো বাক্সে ঠেস দিয়ে রাখুন।

তিনটা কৌশল ফল অনেক বদলে দেয়। এক, একবারে ভালো হবে না ধরে নিয়ে পাঁচবার নিন, তারপর সবচেয়ে ভালোটা রাখুন। দুই, স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করার বদলে চারটা লাইন কাগজে লিখে ক্যামেরার পাশে টাঙিয়ে রাখুন। তিন, নিজে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে না চাইলে দোকানের যে কর্মী সবচেয়ে সহজে কথা বলেন তাঁকে দাঁড় করান, তবে তাঁর অনুমতি নিয়ে।

ক্রিয়েটরকে দিয়ে করালে যা জেনে নিবেন

ঢাকায় এখন এই কাজটার জন্য আলাদা একটা বাজার তৈরি হয়েছে, আর দর সেখানে অনেক কিছুর উপর বদলায়: কে করছেন, তাঁর কত অনুসারী, ভিডিওটা তাঁর নিজের পেজে যাবে নাকি শুধু আপনাকে দেওয়া হবে, আর আপনি কতদিন ওটা বিজ্ঞাপনে চালাবেন। এত ভিন্নতার মধ্যে একটা সংখ্যা বলে দেওয়া বরং বিভ্রান্ত করবে, তাই কয়েকজনের কাছ থেকে দর নিয়ে তুলনা করুন।

দর জিজ্ঞেস করার সময় এই পাঁচটা কথা আগেই পরিষ্কার করে নিন:

শেষ কথাটা মনে রাখুন: দাম নিয়ে দরকষাকষির চেয়ে ব্যবহারের শর্ত নিয়ে পরিষ্কার হওয়া বেশি জরুরি। ভিডিওটা তিন মাস পর আর চালাতে না পারলে সস্তা দামটাও দামি পড়ে।

AI দিয়ে বানালে আজ কী পাওয়া যায়, কী যায় না

তৃতীয় পথটা নতুন, আর এখানে সৎ থাকাটা জরুরি, কারণ এই জায়গায় প্রতিশ্রুতি সবচেয়ে বেশি।

যা আজ পাওয়া যায়: প্রোডাক্টের একটা ছবি দিলে একজন মানুষকে সেটা হাতে ধরে বাংলায় কথা বলতে দেখা যায়, পনেরো সেকেন্ডের ভিডিওতে। মানুষটা হতে পারেন আপনি নিজে, নিজের সেলফি দিয়ে, অথবা তৈরি উপস্থাপকদের একজন। স্ক্রিপ্ট AI লিখে দেয়, আপনি বদলে নেন। কণ্ঠটাও দুই রকম হতে পারে, AI-র কণ্ঠ, অথবা আপনার নিজের কণ্ঠ, মাইক্রোফোনে কয়েক সেকেন্ড বলে দিলে উপস্থাপকের ঠোঁট আপনার কণ্ঠের সাথে মিলে যায়। ভিডিও বানাতে সময় লাগে দুই থেকে চার মিনিট।

যা আজ পাওয়া যায় না, আর এটাই সবচেয়ে জরুরি অংশ:

তাই বাস্তব ব্যবহারটা এরকম দাঁড়ায়: ভিডিওর মানুষ আর কথা AI বানায়, আর পর্দার লেখাটা আপনি পরে বসান। ছবি বানানোর ধাপে প্রোডাক্টটা উপস্থাপকের হাতে বসানো একটা ছবি আগে দেখানো হয়, আপনি দেখে "ঠিক আছে" বললে তবেই ভিডিও বানানো শুরু হয়, তাই ভুল ছবিতে খরচ হয়ে যাওয়ার ভয় নেই।

Token-এ খরচটা কত

সংখ্যাটা সরাসরি বলে দিই, কারণ আন্দাজে হিসাব করতে গেলে ভুল হয়।

BanglaCodes-এ ১৫ সেকেন্ডের একটা UGC বিজ্ঞাপন, গানসহ, সাশ্রয়ী মানে ৮৫,০০০ Token, আর ভালো মানে ১,২১,০০০ Token। দামটা বানানো শুরুর আগেই একটা সংখ্যা হিসেবে দেখানো হয়, আর ভিডিও না হলে Token ফেরত আসে।

প্যাকগুলোর হিসাব মিলিয়ে দেখুন: ৳৪৯৯-এর Starter প্যাকে ১,০০,০০০ Token, মানে সাশ্রয়ী মানের একটা বিজ্ঞাপন। ৳৯৯৯-এর Builder প্যাকে ৩,০০,০০০ Token, মানে তিনটা।

দুটো কথা সৎভাবে যোগ করে রাখি। এক, স্ক্রিপ্ট আর সাধারণ ছবি সবার জন্য ফ্রি, কিন্তু ভিডিও বানানো যায় শুধু Token কেনা অ্যাকাউন্টে। দুই, নিজের কণ্ঠ ব্যবহার করলে AI কণ্ঠের Token লাগে না।

যেভাবে শুরু করবেন

  1. এই সপ্তাহে একটা ভিডিও, তিনটা নয়। একটা প্রোডাক্ট, একটা কথা
  2. কাগজে চার লাইন লিখুন, উপরের ছাঁচ ধরে
  3. প্রোডাক্টের ছবি তুলুন, তিনটা কোণ থেকে, জানালার আলোয়
  4. প্রথমে নিজের ফোনে একবার শুট করে দেখুন। পছন্দ না হলে তখন অন্য পথ ভাবুন
  5. অল্প বাজেটে চালান, আর এক সপ্তাহ পর দেখুন কতজন তিন সেকেন্ড পার করেছেন
  6. যেটা কাজ করেছে, তার আরেকটা সংস্করণ বানান, নতুন কিছু নয়

শেষ ধাপটাই সবচেয়ে বেশি বাদ পড়ে। একটা ভিডিও কাজ করলে মানুষ পরেরবার একদম নতুন কিছু বানাতে বসেন, অথচ কাজের ভিডিওর ছোট ছোট বদলই সবচেয়ে সস্তা লাভ।

সংক্ষেপে