প্রশ্নটা যেভাবে করলে উত্তরটা কাজে লাগে

"একটা ওয়েবসাইট বানাতে কত লাগে", এই প্রশ্নের একটামাত্র উত্তর নেই। আর যিনি এক লাইনে একটা সংখ্যা বলে দেন, তিনি সাধারণত খরচের কোনো একটা অংশ চেপে যান।

!একবারের হোস্টিংয়ের তিনটা স্তর আর দাম

কারণ সাইটের খরচ এক জায়গা থেকে আসে না, আসে চার জায়গা থেকে। দুটো খরচ প্রতি বছর ফিরে ফিরে আসে, একটা শুরুতে একবার লাগে, আর চার নম্বরটা কোনো কাগজে লেখাই থাকে না, অথচ পাঁচ বছর পর হিসাব করলে প্রায়ই সেটাই সবচেয়ে বড়।

তাই প্রশ্নটা বদলে নিন। জিজ্ঞেস করুন: প্রথম বছর কত, আর তার পরের প্রতি বছর কত? এই দুটো সংখ্যা হাতে থাকলে যে কারও কোটেশন দেখে আপনি নিজেই বুঝে যাবেন সেটা সস্তা না দামি।

নিচে চারটা খাত আলাদা করে ধরা হয়েছে, তারপর পাঁচ বছরের হিসাবটা পাশাপাশি বসানো হয়েছে, আর শেষে একটা চেকলিস্ট আছে, যেটা কাউকে টাকা দেওয়ার আগে হাতে রাখা যায়।

চারটা খাত, চারজন আলাদা মানুষ

খাতটাকা কার কাছে যায়কতবার
ডোমেইনডোমেইন কোম্পানিপ্রতি বছর
হোস্টিংহোস্টিং কোম্পানিপ্রতি বছর, বা একবার
বানানোর ফিডেভেলপার বা এজেন্সিশুরুতে
রক্ষণাবেক্ষণডেভেলপার, আর আপনার নিজের সময়সারা বছর, টুকরো টুকরো

খেয়াল করুন, টাকাটা চারজন আলাদা মানুষের কাছে যাচ্ছে। অনেকে ভাবেন এক জায়গায় একবার টাকা দিলেই সব শেষ, তারপর দ্বিতীয় বছরে একটা বিল এসে অবাক হন। এক প্রতিষ্ঠান থেকে চারটাই নেওয়া যায়, কিন্তু তাতে খরচ চারটাই থাকে, শুধু একটা কাগজে লেখা হয়।

ডোমেইন: ঠিকানাটা আপনার, যতদিন ভাড়া দিচ্ছেন

ডোমেইন হলো সাইটের ঠিকানা, মানুষ যেটা ব্রাউজারে লেখে। একটা .com ডোমেইনের দাম সাধারণত বছরে ৳১,০০০ থেকে ৳১,৫০০

এখানে সবচেয়ে জরুরি কথাটা হলো, ডোমেইন কেনা নয়, ভাড়া নেওয়া। প্রতি বছর নবায়ন করতে হয়। ভাড়া দেওয়া বন্ধ করলে ঠিকানাটা ছেড়ে দিতে হয়, আর কিছুদিন পর অন্য কেউ সেটা নিয়ে নিতে পারে। আপনার ভিজিটিং কার্ডে ছাপা ঠিকানাটা তখন অন্য কারও।

দুটো কথা মনে রাখলে এই খাতে আর কোনো দুর্ঘটনা ঘটে না:

আরেকটা কথা, ডোমেইনের টাকাটা কোনো হোস্টিং কোম্পানি মাফ করতে পারে না, ওটা ডোমেইন কোম্পানির প্রাপ্য। কেউ "ডোমেইন ফ্রি" বললে জিজ্ঞেস করুন দ্বিতীয় বছর থেকে কত।

হোস্টিং: এই খরচটাই প্রতি বছর ফিরে আসে

হোস্টিং হলো ঘরটা, যেখানে সাইটের ফাইল আর ছবি রাখা থাকে। বাংলাদেশে সাধারণ শেয়ার্ড হোস্টিং পড়ে বছরে ৳৩,০০০ থেকে ৳৬,০০০

এই সংখ্যাটার সাথে দুটো জিনিস যোগ করে নিন। এক, প্রথম বছরের দামটা প্রায়ই ছাড়ের দাম, নবায়নের দাম আলাদা, তাই আগেই জিজ্ঞেস করে নিন দ্বিতীয় বছরে কত পড়বে। দুই, কোন কোন জিনিস দামের ভেতরে আছে সেটা লিখিয়ে নিন, বিশেষ করে ব্যাকআপ। SSL বা HTTPS, মানে ঠিকানার পাশের তালার চিহ্নটা, এখন প্রায় সব ভালো হোস্টিংয়ে ফ্রি; কেউ আলাদা টাকা চাইলে প্রশ্ন করুন কেন।

সংখ্যাটা ছোট দেখায়, কিন্তু গুণ করলে ছবিটা বদলে যায়। পাঁচ বছরে শুধু হোস্টিংয়েই ৳১৫,০০০ থেকে ৳৩০,০০০, আর দশ বছরে ৳৩০,০০০ থেকে ৳৬০,০০০। একটা এক পেজের ক্যাটালগ সাইটের জন্যও সংখ্যাটা একই, কারণ ভাড়াটা সাইটের আকার দেখে ঠিক হয় না।

বানানোর ফি: যে সংখ্যাটা কেউ আগে বলে দিতে পারে না

এই খাতে কোনো সৎ গড় নেই। এক পেজের পরিচিতি সাইট আর দশ পেজের ক্যাটালগ, দুটোর কাজ এত আলাদা যে একটা সংখ্যা বলে দেওয়া বরং বিভ্রান্ত করবে। তাই সংখ্যা না খুঁজে প্রশ্ন খুঁজুন।

তিন জায়গা থেকে লিখিত কোটেশন নিন, আর প্রতিটাতে এই পাঁচটা কথা স্পষ্ট করে লেখা আছে কি না দেখুন:

সবচেয়ে বড় খরচটা প্রায়ই প্রথম বিলে থাকে না, থাকে পরের প্রতিটা ছোট বদলের বিলে। দাম বদলেছে, নতুন প্রোডাক্ট এসেছে, ঈদের অফার বসাতে হবে, প্রতিবারই একটা ফোন, একটা অপেক্ষা আর একটা বিল। বছরে চারবার হলেও পাঁচ বছরে সেটা কুড়িবার।

যে খরচটা কোনো কোটেশনে লেখা থাকে না

চার নম্বর খাতটা রক্ষণাবেক্ষণ, আর এটাই সবচেয়ে কম আলোচিত। এর ভেতরে অন্তত পাঁচটা জিনিস আছে:

এর মধ্যে "নিজের সময়" খাতটা মানুষ কখনো টাকায় ধরেন না, অথচ ছোট ব্যবসায় মালিকের সময়ই সবচেয়ে দামি জিনিস। আর "সাইট বন্ধ থাকার খরচ" ধরার একটাই সহজ উপায়: ভাবুন ওই দুই সপ্তাহে কয়টা ফোন আসত।

দুটো ফাঁদ, আর দুটোই খুব দামি

ফাঁদ এক, ডোমেইন অন্যের নামে। ডেভেলপার বা এজেন্সি আপনার হয়ে ডোমেইন কিনে দিলে অনেক সময় সেটা তাদের নিজের অ্যাকাউন্টে নিবন্ধিত হয়। কাজ চলাকালে কোনো সমস্যা হয় না। সমস্যা হয় যেদিন আপনি অন্য কারও কাছে যেতে চান, বা সম্পর্কটা খারাপ হয়। তখন ঠিকানাটা আপনার হাতে নেই, আর ঠিকানা মানে আপনার কার্ড, সাইনবোর্ড আর গুগলে জমে থাকা সব কিছু। করণীয়: নিজের ইমেইলে নিজের অ্যাকাউন্ট, আর অ্যাকাউন্টের password আপনার কাছে।

ফাঁদ দুই, নবায়নের তারিখ হারিয়ে যাওয়া। যিনি ডোমেইন কিনেছিলেন তাঁর ইমেইলে নবায়নের চিঠি যায়, আপনার ইমেইলে নয়। ফলে অনেক সাইট এমনিতেই একদিন বন্ধ হয়ে যায়, আর কেউ বুঝতেই পারে না কেন। করণীয়: নিজের ক্যালেন্ডারে তারিখটা বসান, এমনকি যদি অন্য কেউ নবায়ন করেও দেয়।

তৃতীয় একটা ছোট ফাঁদও বলে রাখি। সাইটের ফাইলগুলো কোথায় আছে সেটা জেনে রাখুন। ফাইল হাতে না থাকলে হোস্টিং বদলানোর সময় পুরো সাইট নতুন করে বানানো ছাড়া উপায় থাকে না, আর সেটাই বেশিরভাগ মানুষের দ্বিতীয়বার টাকা যাওয়ার কারণ।

ছোট ব্যবসার সাইটে আসলে যা লাগে

খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখার সবচেয়ে বড় উপায় হলো, যা লাগে না তার জন্য টাকা না দেওয়া। একটা দোকান, ক্লিনিক বা ছোট অফিসের সাইটে যা সত্যিই কাজে লাগে, আর যা বেশি বিক্রি হয়, দুটো পাশাপাশি রাখলাম:

যা সত্যিই লাগেযা বেশি বিক্রি হয়
ফোনে দ্রুত খোলাভারী অ্যানিমেশন আর স্লাইডার
আপনি কে, কী বেচেন, কোথায় আছেনদশ পেজের কাঠামো
ফোন নম্বর আর WhatsApp উপরেভিজিটরের লগইন ব্যবস্থা
দাম আর ছবি হালনাগাদ থাকালাইভ চ্যাট বট
ফর্মের তথ্য সত্যিই আপনার কাছে পৌঁছানোবছরে একবার ডিজাইন বদল

বাঁ পাশের প্রথম চারটা বেশিরভাগ সাইটেই থাকে, তাই ওগুলো নিয়ে দরদাম করার কিছু নেই। পাঁচ নম্বরটা নিয়েই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি হয়, তাই স্পষ্ট করে বলি: সাইটে একটা সুন্দর ফর্ম দেখতে পাওয়া আর সেই ফর্মের তথ্য আপনার কাছে পৌঁছানো, এই দুটো এক জিনিস নয়। ফর্মের তথ্য কোথাও জমা হতে হলে পেছনে একটা ব্যবস্থা লাগে, আর সেটা আলাদা খরচ। কোটেশন নেওয়ার সময় এই একটা প্রশ্ন করে দেখুন, "ফর্ম পূরণ করলে জিনিসটা কোথায় গিয়ে জমা হবে", উত্তর শুনেই অনেক কিছু বোঝা যাবে।

একবারের হোস্টিং মডেলটা কী, আর কী নয়

গত কয়েক বছরে আরেক ধরনের হোস্টিং এসেছে, যেখানে ভাড়াটা প্রতি বছরের বদলে একবারের। BanglaCodes-এ নিজের ডোমেইনে সাইট রাখার ফি একবারের ৳৬,৯৯৯, আর সেটা Token থেকে কাটা হয় (২৪,৪৯,৬৫০ Token)। এরপর নবায়ন নেই, মাসিক বিল নেই।

সৎভাবে বললে, এই ফি-তে যা পাওয়া যায়:

আর যা এই ফি-তে পাওয়া যায় না, সেটা আরও জরুরি:

মডেলটা তুলনা করার সময় এই দুটো লিস্ট পাশাপাশি রাখুন। একবারের ফি মানে ভাড়ার ঝামেলা শেষ, কিন্তু সাইটের সামর্থ্য বদলে যায় না।

পাঁচ বছরের হিসাব পাশাপাশি

সংখ্যাগুলো একসাথে বসালে সিদ্ধান্তটা সহজ হয়ে যায়। একটা সাধারণ ক্যাটালগ সাইট ধরুন, পাঁচ বছর চলবে।

৫ বছরেসাধারণ হোস্টিংএকবারের হোস্টিং
হোস্টিং৳১৫,০০০ থেকে ৳৩০,০০০৳৬,৯৯৯, একবারই
ডোমেইন৳৫,০০০ থেকে ৳৭,৫০০৳৫,০০০ থেকে ৳৭,৫০০
SSLসাধারণত ফ্রিফ্রি
পার্থক্য শুধু হোস্টিংয়ে৳৮,০০১ থেকে ৳২৩,০০১ কম

ডোমেইনের ঘরটা দুই পাশেই এক, কারণ ওই টাকাটা দুই ক্ষেত্রেই ডোমেইন কোম্পানিকে দিতে হয়। তাই আসল পার্থক্যটা পুরোপুরি হোস্টিংয়ের ঘরে, আর সেটা পাঁচ বছরে ৳৮,০০১ থেকে ৳২৩,০০১।

তবে টেবিলটা পড়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দুটো কথা মাথায় রাখুন। এক, উপরের ঘরে বানানোর ফি ধরা হয়নি, কারণ সেটা কাজের পরিধির উপর নির্ভর করে। দুই, সংখ্যা কম মানেই ঠিক সিদ্ধান্ত নয়; আপনার যদি সার্ভারে চলা কিছু দরকার হয়, তাহলে সস্তা ঘরটা আপনার জন্য নয়। দাম মেলানোর আগে সামর্থ্য মেলান।

টাকার বাইরের হিসাবটাও করে ফেলুন

খরচের হিসাব একা কোনো সিদ্ধান্ত দেয় না, কারণ সাইটটা টাকা আনছে কি না সেটাই আসল প্রশ্ন।

সহজ হিসাবটা এরকম। সাইটটা যদি বছরে দশজন নতুন ক্রেতা আনে আর গড়ে প্রতি ক্রেতায় লাভ যদি ৳৭০০ হয়, তাহলে বছরে ৳৭,০০০, মানে সাধারণ হোস্টিংয়ের খরচ প্রায় উঠে গেল। বিশজন আনলে লাভ। শূন্য আনলে পুরোটাই লোকসান, আর তখন হোস্টিং সস্তা না দামি সেটা আলোচনার বিষয়ই না।

তাই ক্রম উল্টে নিন। বেশিরভাগ বিল্ডারে একটা ফ্রি লিংক পাওয়া যায়। ওই লিংকটা ফেসবুক পেজের বায়োতে, WhatsApp-এর পরিচিতিতে আর ভিজিটিং কার্ডে বসিয়ে এক মাস চালান। এক মাস পর গুনে দেখুন কতজন ঢুকল আর কয়টা ফোন এলো। কাজে লাগলে তখন ডোমেইন কিনুন আর হোস্টিংয়ের কথা ভাবুন। কাজে না লাগলে এক টাকাও নষ্ট হলো না।

টাকা দেওয়ার আগে যে চেকলিস্টটা হাতে রাখবেন

কাউকে সাইট বানানোর কাজ দেওয়ার আগে এই দশটা কথা লিখিতভাবে মিলিয়ে নিন:

  1. ডোমেইনটা আমার নিজের অ্যাকাউন্টে কেনা হবে, আমার ইমেইলে, password আমার কাছে
  2. নবায়নের তারিখটা আমি জানি, আর আমার ক্যালেন্ডারে বসানো আছে
  3. দ্বিতীয় বছর থেকে হোস্টিং কত, ছাড়ের দাম নয়, নবায়নের দাম
  4. ব্যাকআপ কে নিবে, কতদিন পরপর, আর ফাইলটা আমি কোথা থেকে নামাতে পারব
  5. সাইটের ফাইলগুলো আমাকে দেওয়া হবে, ZIP হোক বা অন্যভাবে
  6. হস্তান্তরের পর কতবার ফ্রি বদল, আর তারপর প্রতিটা বদলে কত
  7. দাম আর ছবি আমি নিজে বদলাতে পারব কি না, নাকি প্রতিবার ফোন করতে হবে
  8. ফর্ম পূরণ করলে তথ্যটা ঠিক কোথায় জমা হবে, আর সেটা আলাদা খরচ কি না
  9. মোবাইলে দেখানোর দায়িত্ব কাজের ভেতরে আছে, আর হস্তান্তরের দিন আমি নিজের ফোনে খুলে দেখব
  10. লেখা আর ছবি কে দিবে, আমি না তাঁরা, আর না দিলে কী বসবে

দশটার একটাও ছোট নয়, তবে এক থেকে তিন নম্বর সবচেয়ে বেশি টাকা বাঁচায়। আর একটা কথা: এই প্রশ্নগুলো করলে ভালো ডেভেলপার বিরক্ত হন না, বরং খুশি হন, কারণ তাতে পরে ভুল বোঝাবুঝি কমে।

সংক্ষেপে