বিয়ের বায়োডাটা লেখার নিয়ম, আর যা কখনো লিখবেন না

একটা কাগজ, যেটা আপনার চেয়ে বেশি জায়গায় যায়

বায়োডাটা বানানোর সময় মানুষ একটা কথা ভুলে যান: এই কাগজটা এক জায়গায় থামে না।

আপনি দিচ্ছেন ঘটককে বা এক আত্মীয়কে। তিনি পাঠাচ্ছেন দুই পরিবারে। সেখান থেকে WhatsApp-এ, তারপর আরেকজনের কাছে। ছয় মাস পর কাগজটা এমন দশজনের ফোনে আছে যাঁদের আপনি চেনেনই না, আর মুছে ফেলার কোনো উপায় নেই।

এটা ভয় দেখানোর কথা নয়, শুধু হিসাবের কথা। যা লিখছেন সেটা এভাবেই ছড়াবে ধরে নিয়ে লিখলে বায়োডাটাটা আপনাআপনি ঠিক জায়গায় থামে।

সাতটা ভাগ, এই ক্রমে

এক পাতা যথেষ্ট, আর প্রায় সব পরিবারে ক্রমটা এক।

ভাগকী থাকে
ব্যক্তিগত তথ্যনাম, জন্মতারিখ আর বয়স, উচ্চতা, গায়ের রং, রক্তের গ্রুপ, বৈবাহিক অবস্থা
শিক্ষাগত যোগ্যতাপরীক্ষা, প্রতিষ্ঠান, সাল, ফল
পেশা ও আয়কী করেন, কোথায়, আর আয় (দিতে চাইলে)
পারিবারিক তথ্যপিতা ও মাতার নাম ও পেশা, ভাই-বোন কতজন আর কী করেন
ঠিকানাস্থায়ী আর বর্তমান, এলাকা পর্যন্ত
প্রত্যাশাতিন থেকে পাঁচ লাইন
যোগাযোগঅভিভাবকের নাম, সম্পর্ক আর ফোন

ধর্মীয় বিষয়ের একটা ভাগ অনেক পরিবারে থাকে, কারও কারও থাকে না। যেটা আপনার পরিবারের নিয়ম, সেটাই ঠিক। না থাকলে কেউ কিছু মনে করে না, আর থাকলে সেটা সংক্ষেপে থাকাই ভালো।

যা কখনো লিখবেন না

এই তালিকাটাই এই লেখার আসল অংশ, কারণ বাকিটা প্রায় সবাই জানেন।

জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের নম্বর। বিয়ের কথা এগোনোর জন্য এই নম্বর কারও লাগে না। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর কাগজপত্রের সময় লাগবে, তখন সরাসরি দিবেন। বায়োডাটায় বসানো মানে অচেনা লোকের হাতে চলে যাওয়া।

বাসার পূর্ণ ঠিকানা। এলাকার নাম যথেষ্ট, যেমন "মিরপুর ১১, ঢাকা"। বাসা নম্বর, রোড নম্বর আর ফ্ল্যাট নম্বর দেওয়ার দরকার পড়ে দেখা করার আগে, আর তখন সেটা ফোনে বলে দেওয়া যায়।

নিজের সরাসরি মোবাইল নম্বর। অভিভাবকের নম্বর দিন। এটা শুধু ভদ্রতার নিয়ম নয়, ব্যবহারিক কারণও আছে: বায়োডাটা যত দূর যায়, অচেনা নম্বর থেকে ফোনও তত দূর থেকে আসে।

অফিসের পরিচয়পত্র বা বেতনের কাগজের ছবি। পেশা আর প্রতিষ্ঠানের নাম যথেষ্ট। প্রমাণ চাইলে সেটা পরের ধাপের কথা।

ছবি, যদি পরিবার না চায়। অনেক পরিবারে ছবি দেওয়া হয় না, অনেকে দেন। এটা পরিবারের সিদ্ধান্ত, তবে মনে রাখবেন ছবিটা কাগজের সাথেই ঘুরবে। দিলে সাধারণ একটা ছবি দিন, আর ফাইলটা যেন খুব বড় রেজলিউশনের না হয়।

সোশ্যাল মিডিয়ার লিংক। এটা বায়োডাটার জিনিস নয়। কেউ চাইলে খুঁজে নিবেন, আর সেটা তাঁদের ব্যাপার।

প্রত্যাশার ঘরটা যেভাবে লিখলে কাজে লাগে

এই এক ঘরে সবচেয়ে বেশি ভুল হয়, দুই দিক থেকেই।

একদল লেখেন এত অল্প যে কিছুই বোঝা যায় না: "ভালো পরিবারের ধার্মিক পাত্রী"। আরেক দল লেখেন এত লম্বা তালিকা যে পড়তে গিয়ে মানুষ থেমে যান।

কাজের নিয়মটা সহজ: তিন থেকে পাঁচ লাইন, আর যা সত্যিই জরুরি সেটুকুই।

দুর্বল: "সুন্দরী, লম্বা, ফর্সা, সরকারি চাকরিজীবী, ঢাকায় নিজস্ব বাড়ি আছে এমন পরিবার।"

ভালো: "পরিবারের সাথে মানিয়ে চলতে পারেন এমন কাউকে খুঁজছি। পড়াশোনা অন্তত স্নাতক। চাকরি করলে আপত্তি নেই, না করলেও নেই। ঢাকায় থাকতে রাজি থাকতে হবে, কারণ কর্মস্থল এখানেই।"

পার্থক্যটা হলো দ্বিতীয়টা পড়ে বোঝা যায় আপনি কেমন মানুষ। প্রথমটা পড়ে শুধু একটা মাপের তালিকা বোঝা যায়, আর ওই তালিকাগুলো সব বায়োডাটায় প্রায় একই থাকে।

চেহারার মাপ দিয়ে প্রত্যাশা লেখা এড়িয়ে চলুন। ওটা লিখে দিলে যে সম্বন্ধগুলো আসবে না, তার মধ্যে ভালোগুলোও থাকতে পারে।

আয়ের ঘরে কী লিখবেন

অনেকে এই ঘরটা নিয়ে অস্বস্তিতে থাকেন, আর তাই হয় বাড়িয়ে লেখেন, নয় ফাঁকা রাখেন।

তিনটা পথই গ্রহণযোগ্য: সংখ্যাটা লেখা, একটা পরিসর লেখা, বা "আলোচনা সাপেক্ষে" লেখা। কোনটা লিখবেন সেটা পরিবারের সিদ্ধান্ত।

যেটা করবেন না সেটা হলো বাড়িয়ে লেখা। এটা এমন একটা তথ্য যা পরে যাচাই হয়, আর ধরা পড়লে বাকি সবকিছুর বিশ্বাসযোগ্যতা একসাথে নষ্ট হয়।

যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়

ভুলকেন সমস্যা
সিভির ছকে বানানোক্যারিয়ার অবজেকটিভ আর অর্জনের বুলেট এখানে বেমানান
দুই পাতা বা তার বেশিপড়া হয় না, আর বাড়তি তথ্যগুলোই সাধারণত অপ্রয়োজনীয়
রঙিন নকশাদার ব্যাকগ্রাউন্ডছাপলে লেখা পড়া যায় না, ফোনেও ভালো দেখায় না
বয়স আর জন্মতারিখে অমিলছোট ভুল, কিন্তু সন্দেহ তৈরি করে
বানিয়ে লেখা তথ্যপরে যাচাই হয়, আর তখন সব প্রশ্নের মুখে পড়ে
ভাই-বোনের ব্যক্তিগত বিবরণওটা তাঁদের তথ্য, আপনার দেওয়ার জিনিস নয়
ফাইলের নাম biodata.pdfদশটা একই নামের ফাইলে আপনারটা হারিয়ে যায়

ভাই-বোনের ঘরটা নিয়ে একটু বলা দরকার। কতজন আর কী করেন, এটুকু যথেষ্ট। কার বিয়ে হয়েছে, কে কোথায় থাকেন, কার আয় কত, এসব তাঁদের নিজেদের তথ্য, আর তাঁরা এই কাগজে সেটা দিতে রাজি হয়েছেন কি না সেটা আপনি জানেন না।

ছাপা আর পাঠানো

PDF করে পাঠান, ছবি তুলে নয়। ছবি তুললে লেখা ঝাপসা হয়, আর ছোট ফোনে পড়া যায় না।

ফাইলের নামে নিজের নাম রাখুন, যেমন রফিকুল-ইসলাম-বায়োডাটা.pdf। ঘটক বা আত্মীয়ের ফোনে ডজনখানেক বায়োডাটা থাকে, আর সবগুলোর নাম biodata.pdf হলে আপনারটা খুঁজে পাওয়াই কঠিন।

ছাপার দরকার হলে সাদা কাগজে সাধারণ ছাপাই যথেষ্ট। এক পাতায় ধরে গেলে সবচেয়ে ভালো।

AI দিয়ে বায়োডাটা বানালে

কাঠামোটা নির্দিষ্ট বলে এই কাজটা AI ভালো পারে, তবে দুটো জায়গায় সতর্ক থাকতে হয়।

প্রথম, তথ্যগুলো নিজে বসান। নাম, সাল, ফল, পেশা, এসব AI জানে না। না জানলে সে আন্দাজ করে বসিয়ে দিতে পারে, আর ওটাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল বলে দেওয়ার সবচেয়ে সাধারণ জায়গা। বায়োডাটায় একটা ভুল সাল পরে ব্যাখ্যা করতে হয়।

দ্বিতীয়, বিয়ের বায়োডাটা চান সেটা বলে দিন। শুধু "বায়োডাটা" বললে অনেক সময় চাকরির সিভির ছকটা আসে, কারণ দুই কাগজের নাম প্রায় এক। "বিয়ের বায়োডাটা" লিখলে ঠিক ছকটাই আসে।

BanglaCodes-এর চ্যাটে লেখার বাক্সের নিচের "আরও" মেনুতে বায়োডাটা নামে একটা বাটন আছে। ওটায় চাপলে এক পাতার ছাপার মতো একটা বায়োডাটা তৈরি হয় আর PDF করে নামানো যায়। ফ্রি Model-এই কাজটা হয়।

চাকরির জন্য যে কাগজটা লাগে সেটা আলাদা জিনিস, আর তার ছক দুই রকম; সেটা লেখা আছে সিভি লেখার নিয়মে

প্রশ্নোত্তর

বায়োডাটা আর সিভি কি এক জিনিস? না, দুটো আলাদা কাগজ। সিভি যায় নিয়োগদাতার কাছে আর সেখানে কাজের অভিজ্ঞতা আর অর্জন মুখ্য। বিয়ের বায়োডাটা যায় পরিবারের কাছে আর সেখানে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিচয় মুখ্য। সিভির ছকে বায়োডাটা বানালে সেটা বেমানান দেখায়।

বায়োডাটা কত পাতা হওয়া উচিত? এক পাতা। দুই পাতা হয়ে গেলে বুঝবেন এমন কিছু ঢুকেছে যা দরকার ছিল না, সাধারণত লম্বা প্রত্যাশার তালিকা বা পরিবারের বাড়তি বিবরণ। জায়গা কম পড়লে তথ্য বাড়ানোর বদলে ছাঁটুন।

ছবি দিব কি না? পরিবারের সিদ্ধান্ত, আর দুই রকমই স্বাভাবিক। দিলে মনে রাখবেন ছবিটা কাগজের সাথেই ঘুরবে, তাই সাধারণ একটা ছবি দিন। না দিলেও সম্বন্ধ আটকায় না, দেখা করার আগে ছবি চাওয়া হলে তখন আলাদা করে দেওয়া যায়।

আয় লেখা কি বাধ্যতামূলক? না। সংখ্যা, পরিসর বা "আলোচনা সাপেক্ষে", তিনটাই চলে। কেউ কেউ ইচ্ছে করে ফাঁকা রাখেন এবং সেটাও অস্বাভাবিক নয়। শুধু বাড়িয়ে লিখবেন না, কারণ ওটা পরে যাচাই হয়।

ঠিকানা কতটুকু লিখব? এলাকা আর জেলা পর্যন্ত, যেমন "মিরপুর ১১, ঢাকা" বা "চৌহালী, সিরাজগঞ্জ"। বাসা নম্বর বা রোড নম্বর বায়োডাটায় দরকার নেই; দেখা করার কথা হলে তখন ফোনে বলে দিবেন।

গায়ের রং লেখা কি দরকার? বাংলাদেশে প্রচলিত ছকে ঘরটা থাকে, তবে না লিখলে কেউ ফেরত পাঠায় না। যদি লিখতেই হয় তাহলে সহজ শব্দে লিখুন, আর প্রত্যাশার ঘরে অন্যের গায়ের রঙের শর্ত না দেওয়াই ভালো।

ধর্মীয় বিষয়ের ঘরটা রাখব? পরিবারের নিয়ম অনুযায়ী। অনেক পরিবারে নামাজ বা পর্দার কথা লেখা হয়, অনেক পরিবারে হয় না। রাখলে সংক্ষেপে রাখুন, দুই থেকে তিন লাইন যথেষ্ট।

একই বায়োডাটা সবাইকে পাঠানো যায়? যায়, আর সেটাই স্বাভাবিক। তবে প্রত্যাশার ঘরটা মাঝেমধ্যে পড়ে দেখবেন, কারণ ছয় মাস পর নিজের কথাগুলোই আর মিলছে না, এমন হয়। বাকি তথ্য বদলালে, যেমন নতুন চাকরি, তখন ফাইলটা হালনাগাদ করুন।

পুরোনো বায়োডাটা কি ফেরত নেওয়া যায়? কার্যত যায় না, আর এটাই এই কাগজ নিয়ে সবচেয়ে জরুরি কথা। একবার পাঠানো হয়ে গেলে সেটা কার কাছে গেছে আপনি জানবেন না। তাই যা পরে ফিরিয়ে নিতে চাইতে পারেন, সেটা প্রথমেই লিখবেন না।

সংক্ষেপে