বিয়ের কার্ড আর দাওয়াতপত্রের নিয়ম, ছাপাতে দেওয়ার আগে
যে ভুলটার খরচ পাঁচশো কার্ড
দাওয়াত কার্ডের সবচেয়ে দামি ভুলটা ডিজাইনের নয়, তথ্যের।
তারিখটা লেখা আছে, কিন্তু বার লেখা নেই। ঠিকানায় কমিউনিটি সেন্টারের নাম আছে, কিন্তু এলাকা নেই। সময় লেখা আছে "সন্ধ্যায়"।
এগুলো ধরা পড়ে ছাপা হয়ে যাওয়ার পর, যখন প্রথম দশজন ফোন করে জিজ্ঞেস করেন জায়গাটা ঠিক কোথায়। তখন আর কিছু করার থাকে না, কারণ কার্ড ছাপা একবারের কাজ।
তাই ডিজাইনে হাত দেওয়ার আগে তথ্যগুলো ঠিক করে নেওয়া ভালো।
পাঁচটা জিনিস, এই ক্রমে
| ক্রম | কী | কতটা বড় |
| ১ | কার অনুষ্ঠান, বা কী উপলক্ষ | সবচেয়ে বড়, বাকি লেখার আড়াই থেকে তিন গুণ |
| ২ | তারিখ আর বার | দ্বিতীয় বড় |
| ৩ | সময় | তারিখের সাথে বা নিচে |
| ৪ | ঠিকানা | সাধারণ মাপ, কিন্তু স্পষ্ট |
| ৫ | কে নিমন্ত্রণ করছেন | নিচে, ছোট |
চোখ কার্ডে পড়ার পর প্রথম যে জিনিসটা খোঁজে সেটা হলো "এটা কার"। তাই নামটা বা উপলক্ষটাই সবচেয়ে বড় থাকবে। এরপর তারিখ। মানুষ কার্ড হাতে নিয়েই ক্যালেন্ডার মেলায়।
তারিখ, বার আর সময়
তিনটা নিয়ম, তিনটাই ফোন বাঁচায়।
তারিখের সাথে বার লিখুন। "১৫ ডিসেম্বর" আর "১৫ ডিসেম্বর, শুক্রবার" এর মধ্যে পার্থক্যটা হলো দ্বিতীয়টা পড়ে মানুষ সাথে সাথে বুঝে ফেলেন তাঁর ছুটি আছে কি না।
সময় নির্দিষ্ট করে লিখুন। "সন্ধ্যা ৭টা" লিখুন, "সন্ধ্যায়" নয়। অনুষ্ঠান দেরিতে শুরু হবে জেনেও একটা সময় লিখতে হয়, নইলে অতিথিরা কখন আসবেন সেটা নিজেরাই ঠিক করেন।
বাংলা আর ইংরেজি তারিখ মিলিয়ে দেখুন। কার্ডে দুই ভাষায় তারিখ থাকলে দুটো এক কি না, সেটা ছাপার আগে অন্তত দুজন আলাদা করে মিলিয়ে দেখুন। এই ভুলটা খুব হয়, আর ধরা পড়ে সবার শেষে।
ঠিকানা যেভাবে লিখলে মানুষ পৌঁছায়
শুধু ভেন্যুর নাম লিখে দেওয়া যথেষ্ট নয়, কারণ একই নামের কমিউনিটি সেন্টার একাধিক এলাকায় থাকে।
যা লিখবেন: ভেন্যুর নাম, রোড বা ব্লক, এলাকা, আর একটা চেনা ল্যান্ডমার্ক। "মিরপুর ১০ গোল চত্বর থেকে দুই মিনিট" এই এক লাইনে যা কাজ হয়, পুরো ঠিকানাতেও তা হয় না।
জায়গা থাকলে একটা QR কোড দিন যেটা ম্যাপ খুলবে। প্রায় সব অতিথির ফোনে ক্যামেরা আছে, আর এতে ফোন করে জিজ্ঞেস করার দরকারই পড়ে না।
বিয়ের কার্ডে যা বাড়তি লাগে
বিয়ের কার্ডে সাধারণত একাধিক অনুষ্ঠান থাকে, আর সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি হয় এখানেই।
হলুদ, বিয়ে আর বৌভাত, প্রতিটার আলাদা তারিখ, সময় আর জায়গা হতে পারে। এগুলো অনুচ্ছেদে না লিখে ছোট একটা তালিকায় দিন। তিন লাইনের তালিকা এক নজরে পড়া যায়, তিন অনুচ্ছেদ যায় না।
আর লিখে দিন কোন অনুষ্ঠানে কাকে নিমন্ত্রণ করা হচ্ছে। সব অতিথি সব অনুষ্ঠানে যান না, আর এটা লেখা না থাকলে মানুষ অস্বস্তিতে পড়েন।
"নিমন্ত্রণে" অংশে কার নাম যাবে সেটা পরিবারের সিদ্ধান্ত, তবে যাঁর নাম আছে তাঁর একটা ফোন নম্বর থাকলে অতিথিদের সুবিধা হয়।
ছাপাতে দেওয়ার আগে
ডিজাইন ঠিক থাকলেও ছাপায় নষ্ট হতে পারে, আর সেটা ঠেকানোর নিয়ম কয়েকটা।
- কিনারা থেকে লেখা দূরে রাখুন। ছাপার পর কাগজ কাটা হয়, আর কাটাটা এক-দুই মিলিমিটার এদিক-ওদিক হয়। তাই লেখা কিনারা থেকে অন্তত পাঁচ মিলিমিটার ভেতরে রাখুন।
- ব্যাকগ্রাউন্ড কিনারার বাইরে পর্যন্ত টানুন। রং বা নকশা যদি কার্ডের কিনারা পর্যন্ত যায়, সেটা তিন মিলিমিটার বাড়িয়ে আঁকতে হয়, নইলে কাটার পর সাদা রেখা থেকে যায়। ছাপাখানায় একে বলে ব্লিড।
- ছাপার জন্য রঙের পদ্ধতি আলাদা। পর্দায় যে রং, ছাপায় ঠিক সেটা আসে না। ছাপাখানাকে জিজ্ঞেস করুন তাঁরা কোন পদ্ধতির ফাইল চান, আর গাঢ় রং হলে একটা নমুনা ছাপিয়ে দেখে নিন।
- বাংলা লেখা ছবি হিসেবে নয়। যুক্তবর্ণ ভাঙার ঝুঁকি থাকে, তাই ছাপার আগে ফাইলটা খুলে অন্তত একবার নিজে পড়ুন।
ডিজাইনে যা এড়িয়ে চলবেন
সুন্দর কার্ড আর ভিড়ভাট্টা কার্ডের মধ্যে পার্থক্যটা সংযমের।
- দুইয়ের বেশি ফন্ট নয়, একটা শিরোনামের জন্য আর একটা বাকি সবের জন্য
- একটাই মূল নকশা, তিন রকম নকশা একসাথে নয়
- নকশাদার ব্যাকগ্রাউন্ডের উপর সরাসরি লেখা নয়, লেখার নিচে একটা হালকা পরিষ্কার জায়গা রাখুন
- রংধনু বর্ডার আর নানা রকম ক্লিপ-আর্টের ভিড় নয়
দুইটা রং আর একটা ধাতব ছোঁয়া, যেমন ক্রিমের সাথে গাঢ় সবুজ আর সোনালি, প্রায় সব উপলক্ষে কাজ করে।
ডিজিটাল কার্ড
এখন অনেকেই WhatsApp আর ফেসবুকে কার্ড পাঠান, আর সেটার মাপ আলাদা।
ফোনের পর্দার জন্য লম্বা কার্ড বানান, ছাপার কার্ডটা ছবি করে পাঠাবেন না; ওটা পড়তে গিয়ে সবাইকে জুম করতে হয়। লেখা বড় রাখুন, কারণ অনেকে ছোট পর্দায় দেখবেন।
আর ডিজিটাল কার্ডে ম্যাপের লিংকটা সরাসরি দিতে পারেন, QR লাগে না।
AI দিয়ে কার্ড বানালে
তথ্যগুলো ঠিক করে নেওয়ার পর ডিজাইনের কাজটা দ্রুত হয়।
নাম আর তারিখ নিজে বসান। বানানো নামের কার্ড ছাপিয়ে ফেলার মতো ভুল আর হয় না। তথ্যগুলো লিখে দিন, তারপর সাজাতে বলুন।
ছবির ভেতরে বাংলা লেখা বসাতে বলবেন না। ছবি বানানোর মডেলগুলো বাংলা যুক্তবর্ণে এখনো দুর্বল। লেখাটা যেন আলাদা করে বসে, তাহলে বানান আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকে।
একটা নমুনা ছাপিয়ে দেখুন। পাঁচশো ছাপানোর আগে একটা ছাপিয়ে হাতে নিয়ে দেখা সবচেয়ে সস্তা বিমা।
BanglaCodes-এর চ্যাটে উপলক্ষ, তারিখ আর ঠিকানা লিখে কার্ড চাইলে সেটা বানিয়ে দেয়, আর PDF করে নামানো যায়।

কীভাবে গুছিয়ে বললে ঠিক জিনিসটা আসে, সেটা লেখা আছে ভালো prompt লেখার নিয়মে।
প্রশ্নোত্তর
কার্ডে RSVP লেখা কি দরকার? বাংলাদেশে বেশিরভাগ অনুষ্ঠানে আলাদা করে জানানোর রীতি নেই, তাই বাধ্যতামূলক নয়। তবে যেখানে আসন সীমিত বা খাবারের হিসাব দরকার, সেখানে একটা নাম আর ফোন নম্বর দিয়ে "জানিয়ে রাখলে সুবিধা হয়" লিখে দিলে কাজে দেয়।
কার্ডে কি ছবি দেওয়া যায়? দাওয়াত কার্ডে সাধারণত দেওয়া হয় না, আর না দেওয়াই নিরাপদ। ছবি দিলে কার্ডটা পোস্টারের মতো দেখায় আর লেখার জায়গা কমে যায়। সংরক্ষণের জন্য আলাদা ছবি রাখাই ভালো।
দুই ভাষায় কার্ড করলে কী দেখব? দুই ভাষার তারিখ, সময় আর ঠিকানা এক কি না, সেটাই। এক পাশে বাংলা আর আরেক পাশে ইংরেজি রাখলে পড়তে সহজ হয়, দুই ভাষা একসাথে মিশিয়ে দিলে ভিড় লাগে।
কতগুলো কার্ড ছাপাব? অতিথির সংখ্যার হিসাব করে অন্তত দশ শতাংশ বেশি। শেষ মুহূর্তে নাম যোগ হয়, কার্ড হারায়, আর অল্প কয়েকটার জন্য দ্বিতীয়বার ছাপাতে গেলে খরচ অনেক বেশি পড়ে।
সার্টিফিকেট বা সনদপত্রও কি একইভাবে বানানো যায়? হ্যাঁ, ছকটা কাছাকাছি, শুধু সাজানো আলাদা। সনদে প্রাপকের নামটাই সবচেয়ে বড় থাকে মাঝখানে, উপরে প্রতিষ্ঠানের ছোট লোগো, নিচে বাঁয়ে ও ডানে স্বাক্ষরের রেখা আর তারিখ। কাগজটা আড়াআড়ি হয়।
ছাপাখানায় কোন ফাইল দিব? PDF, আর ছাপাখানাকে আগেই জিজ্ঞেস করে নিন তাঁরা কেমন ফাইল চান, বিশেষ করে ব্লিড আর রঙের পদ্ধতি নিয়ে। প্রশ্নটা আগে করলে কাজটা একবারেই হয়ে যায়।
ফোনের জন্য আর ছাপার জন্য কি আলাদা কার্ড লাগে? লাগে, আর দুটোর মাপ আলাদা। ছাপার কার্ডের ছবি তুলে WhatsApp-এ পাঠালে লেখা ছোট দেখায়। একই তথ্য দিয়ে দুটো আলাদা সাজানো বানিয়ে নেওয়াই ভালো।
শেষ মুহূর্তে তারিখ বদলে গেলে? ছাপা হয়ে গেলে নতুন করে ছাপানো ছাড়া উপায় নেই, তাই তারিখ চূড়ান্ত হওয়ার আগে ছাপাতে দিবেন না। ডিজিটাল কার্ড হলে বদলে আবার পাঠানো যায়, তবে আগে যাঁরা পেয়েছেন তাঁদের আলাদা করে জানিয়ে দিন।
সংক্ষেপে
- পাঁচটা তথ্য: উপলক্ষ, তারিখ ও বার, সময়, ঠিকানা, নিমন্ত্রণকারী
- তারিখের পাশে বার, আর সময় নির্দিষ্ট করে, "সন্ধ্যায়" নয়
- ঠিকানায় এলাকা আর একটা চেনা ল্যান্ডমার্ক, জায়গা থাকলে ম্যাপের QR
- বিয়ের কার্ডে অনুষ্ঠানগুলো ছোট তালিকায়, অনুচ্ছেদে নয়
- লেখা কিনারা থেকে ভেতরে, ব্যাকগ্রাউন্ড কিনারার বাইরে পর্যন্ত
- দুইয়ের বেশি ফন্ট নয়, একটাই মূল নকশা
- পাঁচশো ছাপানোর আগে একটা ছাপিয়ে হাতে নিয়ে দেখুন