দোকানের হিসাবের খাতা ফোনে, আর যে কথাটা আগে জানা দরকার

নাসির উদ্দিন শামীমপ্রতিষ্ঠাতা, BanglaCodes.Com

৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · ৮ মিনিটের পড়া · হিসাব, দোকান

এক নজরে উত্তর

দোকানের দৈনিক আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখার অ্যাপ বানানো যায় কিভাবে?

বিল্ডারে বললে একটা হিসাবের অ্যাপ বানিয়ে দেয়, যেখানে দিনের বিক্রি আর খরচ লিখলে যোগ-বিয়োগ নিজে থেকে হয়। তথ্যটা কোথায় জমে সেটা প্ল্যানের উপর নির্ভর করে: ফ্রি সাইটে বা লাইফটাইম হোস্টিংয়ে হিসাব ওই ফোন বা কম্পিউটারেই থাকে, তাই CSV নামিয়ে রাখাই ব্যাকআপ। Business প্ল্যানে ক্লাউড ডেটা চালু করলে হিসাবটা আমাদের সার্ভারে জমে আর পাসকোড দিয়ে যেকোনো ফোন থেকে একই হিসাব দেখা যায়।

খাতার সমস্যা

দোকানের হিসাবের খাতায় দুইটা সমস্যা, আর দুইটাই পুরোনো।

এক, যোগ-বিয়োগ হাতে করতে হয়, আর মাসের শেষে ভুল বের করা কষ্টকর।

দুই, খাতাটা একটাই। দোকানে থাকলে বাসায় নেই, আর ভিজে গেলে বা হারালে কিছুই থাকে না।

ফোনের হিসাবের অ্যাপ প্রথম সমস্যাটা পুরো সমাধান করে। দ্বিতীয়টা আংশিক, আর সেই আংশিক অংশটাই এই লেখার সবচেয়ে জরুরি কথা।

আগে সেই জরুরি কথাটা

এই ধরনের অ্যাপে আপনি যা লিখবেন, তা ওই ফোন বা কম্পিউটারের ভেতরেই থেকে যায়।

মানে:

  • ফোনে লেখা হিসাব কম্পিউটারে খুললে দেখাবে না
  • ব্রাউজারের তথ্য মুছে ফেললে হিসাবও চলে যায়
  • ফোন হারালে ওই হিসাবও যায়

কেন এমন: অ্যাপটা একটা ওয়েব পেজ, আর পেজটা তথ্য রাখে ব্রাউজারের নিজের জায়গায়। এতে সুবিধাও আছে, আপনার বিক্রির হিসাব কারও সার্ভারে যায় না, ইন্টারনেট ছাড়াও কাজ করে।

এটা বদলানো যায়, তবে প্ল্যান লাগে। Business বা Commerce প্ল্যানে "ক্লাউড ডেটা" বলে একটা ব্যবস্থা আছে: সাইট ম্যানেজ পেজে একটা পাসকোড বসিয়ে চালু করলে হিসাবটা আমাদের সার্ভারে জমে, আর পাসকোড যাঁর কাছে আছে তিনি যেকোনো ফোন বা কম্পিউটার থেকে হুবহু একই হিসাব দেখেন। ফোন হারালেও হিসাব থাকে। কীভাবে চালু করবেন সেটা ক্লাউড ডেটার গাইডে ধাপে ধাপে লেখা।

নিচের পুরো লেখাটা ব্রাউজারে জমা রাখার ধরে নিয়ে লেখা, কারণ বেশিরভাগ মানুষ ওখান থেকেই শুরু করেন।

আর একটা কথা প্রথমেই জেনে রাখা দরকার, নইলে মনে হবে অ্যাপটা নষ্ট: বিল্ডারের প্রিভিউতে হিসাব জমা থাকে না। ওখানে পরীক্ষা করে দেখলে পেজ রিফ্রেশ করার পর এন্ট্রিগুলো থাকবে না। সাইটটা Publish করার পর আসল ঠিকানায় (আপনার-নাম.banglacodes.app) খুললে তখন থাকে। ফ্রি শেয়ার লিংকেও থাকে না, ওটাও নিরাপত্তার জন্য আলাদা করে চালানো হয়।

কিন্তু এর মানে হলো ব্যাকআপটা আপনার দায়িত্ব। তাই অ্যাপটা বানানোর সময়ই "CSV নামানোর বাটন রাখো" বলে দিন, আর সপ্তাহে একবার নামিয়ে ফোনের কোনো ফোল্ডারে বা নিজের ইমেইলে পাঠিয়ে রাখুন।

এই এক অভ্যাসেই খাতার দ্বিতীয় সমস্যাটাও সমাধান হয়ে যায়।

কী বললে কাজের অ্যাপ আসে

সাধারণভাবে বললে সাধারণ জিনিস আসে। নির্দিষ্ট করে বলুন।

একটা কাজের উদাহরণ: "দোকানের দৈনিক হিসাবের অ্যাপ বানাও। প্রতিদিনের এন্ট্রিতে থাকবে তারিখ, ধরন (বিক্রি না খরচ), খাত, টাকার অংক আর নোট। খরচের খাতগুলো হবে মাল কেনা, দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারী, যাতায়াত, অন্যান্য। উপরে আজকের বিক্রি, আজকের খরচ আর আজকের লাভ দেখাবে। নিচে মাসের মোট। একটা CSV নামানোর বাটন রাখো। বাংলায়, ফোনে বড় লেখায়।"

তারপর নিজে কয়েকটা এন্ট্রি দিয়ে দেখুন। যা যা অসুবিধা লাগবে সেগুলো একটা একটা করে বলুন, একসাথে দশটা নয়।

যে ঘরগুলো আসলে দরকার

বেশি ঘর মানে বেশি কাজ, আর বেশি কাজ মানে তিন দিন পর আর লেখা হয় না।

ঘরকেন দরকার
তারিখনিজে থেকে আজকের তারিখ বসলে সবচেয়ে ভালো
বিক্রি না খরচদুইটা বাটন, টাইপ করা নয়
খাতখরচ কোথায় যাচ্ছে সেটা মাস শেষে বোঝার একমাত্র উপায়
টাকাবড় ঘর, বড় কিবোর্ড
নোটইচ্ছামতো, কার কাছে বাকি গেল লেখার জন্য

বাকি সব পরে। প্রথম মাসে শুধু এই পাঁচটা ঘর ব্যবহার করে দেখুন লেখার অভ্যাসটা টিকছে কি না। টিকলে তখন বাকিটা যোগ করবেন।

বাকির হিসাব

বাংলাদেশে ছোট দোকানের সবচেয়ে বড় হিসাবের সমস্যাটা বিক্রি নয়, বাকি।

চাইলে অ্যাপে একটা আলাদা লিস্ট রাখতে বলুন: কার কাছে কত বাকি, কবে থেকে, শেষ কবে কিছু দিয়েছেন। শুধু এই একটা লিস্ট অনেক দোকানের জন্য পুরো অ্যাপটার চেয়েও বেশি কাজের।

তবে মনে রাখবেন, এটাও ওই ফোনের ভেতরেই থাকবে। বাকির লিস্ট হারানো মানে টাকা হারানো, তাই এই লিস্টটার CSV আরও নিয়মিত নামিয়ে রাখুন।

মাসের শেষে যা দেখবেন

অ্যাপ বানানোর আসল লাভ সংখ্যা লেখা নয়, সংখ্যা দেখা।

তিনটা জিনিস দেখলেই বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়:

সবচেয়ে বড় খরচের খাত কোনটা। অনেকে ধরে নেন মাল কেনা, আর দেখা যায় অন্য কিছু।

কোন সপ্তাহে বিক্রি কম। ওই সপ্তাহে অফার দেওয়ার সিদ্ধান্তটা তখন অনুমানের নয়।

লাভ বাড়ছে না কমছে। এক মাস দেখে বোঝা যায় না, তিন মাস দেখে যায়।

সংখ্যা থেকে চার্ট বা রিপোর্ট চাইলে সেটাও চ্যাটে বলে বানিয়ে নেওয়া যায়।

একের বেশি মানুষ হলে

দোকানে দুইজন হিসাব লিখলে ফোনের ভেতরে জমা রাখার ব্যবস্থা আর কাজ করে না, কারণ দুইজনের দুই ফোনে দুই হিসাব হবে।

সবচেয়ে সোজা সমাধান ক্লাউড ডেটা, যেটা Business প্ল্যানে আছে: একটা পাসকোড, আর দুইজনেই নিজের ফোন থেকে একই হিসাবে লিখবেন। একটা কথা জেনে রাখবেন, দুইজন একই সময়ে একই সারি বদলালে পরে যিনি সেভ করলেন তাঁরটা থাকবে; ছোট দোকানে এটা সমস্যা করে না।

প্ল্যান নিতে না চাইলে দুইটা পুরোনো পথ থাকে: একটাই ফোন বা ট্যাব হিসাবের জন্য নির্দিষ্ট রাখুন, নয়তো এন্ট্রিগুলো সাইটের ফর্ম দিয়ে নিন যাতে সেগুলো এক জায়গায় জমা হয়।

নিজের দোকানের মাপে হিসাবের অ্যাপ বানাতে হিসাব খাতার পেজ থেকে শুরু করুন।

প্রশ্নোত্তর

হিসাবের তথ্য কি আপনাদের সার্ভারে যায়? আপনি না চাইলে যায় না। সাধারণভাবে তথ্য ব্রাউজারের নিজের জায়গায় থাকে, মানে ওই ফোন বা কম্পিউটারে, আর তখন ব্যাকআপের দায়িত্বও আপনার। Business প্ল্যানে ক্লাউড ডেটা নিজে চালু করলে তখন হিসাবটা আমাদের সার্ভারে জমে, আর সেটা আমাদের নিয়মিত ব্যাকআপেও থাকে। যেকোনো সময় পুরোটা এক ফাইলে নামিয়ে নিতে পারবেন, আর মুছেও দিতে পারবেন।

ফোন বদলালে হিসাব পাব? ব্রাউজারে জমা থাকলে পাবেন না, তাই CSV নামিয়ে রাখার অভ্যাসটা জরুরি। ক্লাউড ডেটা চালু থাকলে পাবেন: নতুন ফোনে সাইটটা খুলে পাসকোড দিলেই পুরো হিসাব নেমে আসে।

ইন্টারনেট ছাড়া চলবে? পেজটা একবার খোলা থাকলে লেখা যায়, কারণ হিসাব ব্রাউজারেই জমা হয়। তবে পেজটা প্রথমবার খুলতে ইন্টারনেট লাগে, তাই দোকানে নেটওয়ার্ক দুর্বল হলে সকালে একবার খুলে রাখাই ভালো। Publish করা সাইট একবার খোলার পর অফলাইনেও চলে।

বিল্ডারে পরীক্ষা করলাম, কিছু জমা থাকছে না কেন? প্রিভিউয়ের ভেতরে জমা রাখার ব্যবস্থাটা বন্ধ থাকে, তাই ওখানে রিফ্রেশ করলে এন্ট্রি চলে যায়। অ্যাপটা Publish করে আপনার-নাম.banglacodes.app ঠিকানায় খুলে দেখুন, ওখানে থাকবে। Publish করা ফ্রি।

Excel-এই তো হয়, অ্যাপ কেন? Excel-এ হয়, যদি আপনি Excel-এ স্বচ্ছন্দ হন। অ্যাপের সুবিধা হলো ফোনে বড় বাটন আর কম ঘর, তাই দোকানে দাঁড়িয়ে দশ সেকেন্ডে একটা এন্ট্রি দেওয়া যায়। আর CSV নামালে সেটা Excel-এই খোলে।

কর্মচারীকে দিয়ে লেখাতে পারব? পারবেন। ক্লাউড ডেটা চালু থাকলে তাঁকে পাসকোডটা দিলেই তিনি নিজের ফোন থেকে একই হিসাবে লিখবেন; তিনি কাজ ছেড়ে গেলে পাসকোড বদলে দিলে সাথে সাথে তাঁর হাত বন্ধ। ক্লাউড ডেটা ছাড়া একই ফোনে হলেই কেবল হয়, আলাদা ফোনে হিসাব দুই জায়গায় ভাগ হয়ে যাবে।

পুরোনো খাতার হিসাব তুলব কিভাবে? পুরোটা তোলার দরকার নেই। একটা তারিখ ঠিক করে সেদিন থেকে শুরু করুন, আর পুরোনো খাতাটা রেখে দিন। মাস দুয়েক পর নতুন অভ্যাসটা দাঁড়িয়ে গেলে পুরোনো হিসাব আর দেখতেই হবে না।

ভ্যাট বা করের হিসাব এটা দিয়ে হবে? এটা দোকানের নিজের হিসাব রাখার খাতা, কর দাখিলের কাগজ নয়। কর বা ভ্যাটের হিসাবের নিয়ম আলাদা, আর সেটা আপনার হিসাবরক্ষকের কাছ থেকে জেনে নিন। তবে গোছানো হিসাব থাকলে তাঁর কাজটা সহজ হয়।

হিসাব থেকে ইনভয়েস বানানো যাবে? সেটা আলাদা কাজ, আর তার নিয়ম আছে ক্যাশ মেমো আর ইনভয়েসের লেখায়। চাইলে একই অ্যাপে দুইটা অংশ রাখতে বলা যায়, তবে প্রথম মাসে শুধু হিসাবটা চালু রাখাই ভালো।

সংক্ষেপে

  • হিসাব সাধারণত জমা থাকে ওই ফোন বা কম্পিউটারের ভেতরে, সার্ভারে নয়
  • সব ডিভাইসে এক হিসাব চাইলে Business প্ল্যানের ক্লাউড ডেটা, একটা পাসকোড দিয়েই চালু
  • বিল্ডারের প্রিভিউতে জমা থাকে না, Publish করার পর থাকে
  • তাই CSV নামানোর বাটন রাখুন আর সপ্তাহে একবার নামিয়ে রাখুন
  • প্রথম মাসে পাঁচটা ঘরই যথেষ্ট: তারিখ, ধরন, খাত, টাকা, নোট
  • বাকির লিস্টটা আলাদা রাখুন, ছোট দোকানে ওটাই সবচেয়ে কাজের
  • মাস শেষে তিনটা জিনিস দেখুন: বড় খরচের খাত, কম বিক্রির সপ্তাহ, লাভের গতি
  • দুইজন লিখলে ফোনের জমা আর চলে না, তখন ক্লাউড ডেটা বা ফর্মের পথ ধরতে হয়