দোকানের হিসাবের খাতা ফোনে, আর যে কথাটা আগে জানা দরকার
খাতার সমস্যা
দোকানের হিসাবের খাতায় দুইটা সমস্যা, আর দুইটাই পুরোনো।
এক, যোগ-বিয়োগ হাতে করতে হয়, আর মাসের শেষে ভুল বের করা কষ্টকর।
দুই, খাতাটা একটাই। দোকানে থাকলে বাসায় নেই, আর ভিজে গেলে বা হারালে কিছুই থাকে না।
ফোনের হিসাবের অ্যাপ প্রথম সমস্যাটা পুরো সমাধান করে। দ্বিতীয়টা আংশিক, আর সেই আংশিক অংশটাই এই লেখার সবচেয়ে জরুরি কথা।
আগে সেই জরুরি কথাটা
এই ধরনের অ্যাপে আপনি যা লিখবেন, তা ওই ফোন বা কম্পিউটারের ভেতরেই থেকে যায়।
মানে:
- ফোনে লেখা হিসাব কম্পিউটারে খুললে দেখাবে না
- ব্রাউজারের তথ্য মুছে ফেললে হিসাবও চলে যায়
- ফোন হারালে ওই হিসাবও যায়
কেন এমন: অ্যাপটা একটা ওয়েব পেজ, আর পেজটা তথ্য রাখে ব্রাউজারের নিজের জায়গায়। এতে সুবিধাও আছে, আপনার বিক্রির হিসাব কারও সার্ভারে যায় না, ইন্টারনেট ছাড়াও কাজ করে।
আর একটা কথা প্রথমেই জেনে রাখা দরকার, নইলে মনে হবে অ্যাপটা নষ্ট: বিল্ডারের প্রিভিউতে হিসাব জমা থাকে না। ওখানে পরীক্ষা করে দেখলে পাতা রিফ্রেশ করার পর এন্ট্রিগুলো থাকবে না। সাইটটা শেয়ার বা Publish করার পর আসল ঠিকানায় খুললে তখন থাকে।
কিন্তু এর মানে হলো ব্যাকআপটা আপনার দায়িত্ব। তাই অ্যাপটা বানানোর সময়ই "CSV নামানোর বাটন রাখো" বলে দিন, আর সপ্তাহে একবার নামিয়ে ফোনের কোনো ফোল্ডারে বা নিজের ইমেইলে পাঠিয়ে রাখুন।
এই এক অভ্যাসেই খাতার দ্বিতীয় সমস্যাটাও সমাধান হয়ে যায়।
কী বললে কাজের অ্যাপ আসে
সাধারণভাবে বললে সাধারণ জিনিস আসে। নির্দিষ্ট করে বলুন।
একটা কাজের উদাহরণ: "দোকানের দৈনিক হিসাবের অ্যাপ বানাও। প্রতিদিনের এন্ট্রিতে থাকবে তারিখ, ধরন (বিক্রি না খরচ), খাত, টাকার অংক আর নোট। খরচের খাতগুলো হবে মাল কেনা, দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারী, যাতায়াত, অন্যান্য। উপরে আজকের বিক্রি, আজকের খরচ আর আজকের লাভ দেখাবে। নিচে মাসের মোট। একটা CSV নামানোর বাটন রাখো। বাংলায়, ফোনে বড় লেখায়।"
তারপর নিজে কয়েকটা এন্ট্রি দিয়ে দেখুন। যা যা অসুবিধা লাগবে সেগুলো একটা একটা করে বলুন, একসাথে দশটা নয়।
যে ঘরগুলো আসলে দরকার
বেশি ঘর মানে বেশি কাজ, আর বেশি কাজ মানে তিন দিন পর আর লেখা হয় না।
| ঘর | কেন দরকার |
| তারিখ | নিজে থেকে আজকের তারিখ বসলে সবচেয়ে ভালো |
| বিক্রি না খরচ | দুইটা বাটন, টাইপ করা নয় |
| খাত | খরচ কোথায় যাচ্ছে সেটা মাস শেষে বোঝার একমাত্র উপায় |
| টাকা | বড় ঘর, বড় কিবোর্ড |
| নোট | ইচ্ছামতো, কার কাছে বাকি গেল লেখার জন্য |
বাকি সব পরে। প্রথম মাসে শুধু এই পাঁচটা ঘর ব্যবহার করে দেখুন লেখার অভ্যাসটা টিকছে কি না। টিকলে তখন বাকিটা যোগ করবেন।
বাকির হিসাব
বাংলাদেশে ছোট দোকানের সবচেয়ে বড় হিসাবের সমস্যাটা বিক্রি নয়, বাকি।
চাইলে অ্যাপে একটা আলাদা তালিকা রাখতে বলুন: কার কাছে কত বাকি, কবে থেকে, শেষ কবে কিছু দিয়েছেন। শুধু এই একটা তালিকা অনেক দোকানের জন্য পুরো অ্যাপটার চেয়েও বেশি কাজের।
তবে মনে রাখবেন, এটাও ওই ফোনের ভেতরেই থাকবে। বাকির তালিকা হারানো মানে টাকা হারানো, তাই এই তালিকাটার CSV আরও নিয়মিত নামিয়ে রাখুন।
মাসের শেষে যা দেখবেন
অ্যাপ বানানোর আসল লাভ সংখ্যা লেখা নয়, সংখ্যা দেখা।
তিনটা জিনিস দেখলেই বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়:
সবচেয়ে বড় খরচের খাত কোনটা। অনেকে ধরে নেন মাল কেনা, আর দেখা যায় অন্য কিছু।
কোন সপ্তাহে বিক্রি কম। ওই সপ্তাহে অফার দেওয়ার সিদ্ধান্তটা তখন অনুমানের নয়।
লাভ বাড়ছে না কমছে। এক মাস দেখে বোঝা যায় না, তিন মাস দেখে যায়।
সংখ্যা থেকে চার্ট বা রিপোর্ট চাইলে সেটাও চ্যাটে বলে বানিয়ে নেওয়া যায়।
একের বেশি মানুষ হলে
দোকানে দুইজন হিসাব লিখলে ফোনের ভেতরে জমা রাখার ব্যবস্থা আর কাজ করে না, কারণ দুইজনের দুই ফোনে দুই হিসাব হবে।
তখন দুইটা পথ: একটাই ফোন বা ট্যাব হিসাবের জন্য নির্দিষ্ট রাখুন, নয়তো এন্ট্রিগুলো সাইটের ফর্ম দিয়ে নিন যাতে সেগুলো এক জায়গায় জমা হয়। দ্বিতীয়টার জন্য হোস্টিং লাগে।
প্রশ্নোত্তর
হিসাবের তথ্য কি আপনাদের সার্ভারে যায়? না। এই ধরনের অ্যাপে লেখা তথ্য ব্রাউজারের নিজের জায়গায় থাকে, মানে ওই ফোন বা কম্পিউটারে। আপনার বিক্রির অংক আমাদের কাছে আসে না, আর এর উল্টো দিকটা হলো ব্যাকআপের দায়িত্বও আপনার।
ফোন বদলালে হিসাব পাব? নতুন ফোনে পুরোনো হিসাব থাকবে না। এই কারণেই CSV নামিয়ে রাখার অভ্যাসটা জরুরি, কারণ ওই ফাইলটা যেকোনো জায়গায় খোলা যায় আর নতুন অ্যাপে বসানোও যায়।
ইন্টারনেট ছাড়া চলবে? পেজটা একবার খোলা থাকলে লেখা যায়, কারণ হিসাব ব্রাউজারেই জমা হয়। তবে পেজটা প্রথমবার খুলতে ইন্টারনেট লাগে, তাই দোকানে নেটওয়ার্ক দুর্বল হলে সকালে একবার খুলে রাখাই ভালো।
বিল্ডারে পরীক্ষা করলাম, কিছু জমা থাকছে না কেন? প্রিভিউয়ের ভেতরে জমা রাখার ব্যবস্থাটা বন্ধ থাকে, তাই ওখানে রিফ্রেশ করলে এন্ট্রি চলে যায়। অ্যাপটা শেয়ার বা Publish করে আসল ঠিকানায় খুলে দেখুন, ওখানে থাকবে।
Excel-এই তো হয়, অ্যাপ কেন? Excel-এ হয়, যদি আপনি Excel-এ স্বচ্ছন্দ হন। অ্যাপের সুবিধা হলো ফোনে বড় বাটন আর কম ঘর, তাই দোকানে দাঁড়িয়ে দশ সেকেন্ডে একটা এন্ট্রি দেওয়া যায়। আর CSV নামালে সেটা Excel-এই খোলে।
কর্মচারীকে দিয়ে লেখাতে পারব? একই ফোনে হলে পারবেন। আলাদা ফোনে হলে হিসাব দুই জায়গায় ভাগ হয়ে যাবে, কারণ তথ্য ডিভাইসের ভেতরে থাকে। একাধিক মানুষ লিখলে ফর্ম আর হোস্টিংয়ের পথটাই ঠিক।
পুরোনো খাতার হিসাব তুলব কীভাবে? পুরোটা তোলার দরকার নেই। একটা তারিখ ঠিক করে সেদিন থেকে শুরু করুন, আর পুরোনো খাতাটা রেখে দিন। মাস দুয়েক পর নতুন অভ্যাসটা দাঁড়িয়ে গেলে পুরোনো হিসাব আর দেখতেই হবে না।
ভ্যাট বা করের হিসাব এটা দিয়ে হবে? এটা দোকানের নিজের হিসাব রাখার খাতা, কর দাখিলের কাগজ নয়। কর বা ভ্যাটের হিসাবের নিয়ম আলাদা, আর সেটা আপনার হিসাবরক্ষকের কাছ থেকে জেনে নিন। তবে গোছানো হিসাব থাকলে তাঁর কাজটা সহজ হয়।
হিসাব থেকে ইনভয়েস বানানো যাবে? সেটা আলাদা কাজ, আর তার নিয়ম আছে ক্যাশ মেমো আর ইনভয়েসের লেখায়। চাইলে একই অ্যাপে দুইটা অংশ রাখতে বলা যায়, তবে প্রথম মাসে শুধু হিসাবটা চালু রাখাই ভালো।
সংক্ষেপে
- হিসাব জমা থাকে ওই ফোন বা কম্পিউটারের ভেতরে, সার্ভারে নয়
- বিল্ডারের প্রিভিউতে জমা থাকে না, Publish করার পর থাকে
- তাই CSV নামানোর বাটন রাখুন আর সপ্তাহে একবার নামিয়ে রাখুন
- প্রথম মাসে পাঁচটা ঘরই যথেষ্ট: তারিখ, ধরন, খাত, টাকা, নোট
- বাকির তালিকাটা আলাদা রাখুন, ছোট দোকানে ওটাই সবচেয়ে কাজের
- মাস শেষে তিনটা জিনিস দেখুন: বড় খরচের খাত, কম বিক্রির সপ্তাহ, লাভের গতি
- দুইজন লিখলে ফোনের জমা আর চলে না, তখন ফর্ম আর হোস্টিং লাগে