প্রেজেন্টেশন বানানোর নিয়ম, স্লাইড যেন পড়া না লাগে

স্লাইড কেন এত খারাপ হয়

প্রায় সব খারাপ প্রেজেন্টেশনের কারণ একটাই: স্লাইডটা বক্তার নোট হিসেবে বানানো হয়েছে, দর্শকের জন্য নয়।

লেখা ঠাসা থাকে, কারণ বক্তা ভুলে যাওয়ার ভয় পান। আর ঠাসা লেখা পর্দায় উঠলে দর্শক পড়তে শুরু করেন, তখন আর শোনেন না। বক্তা তখন পড়ে শোনান, আর ঘরের সবাই একই লেখা দুইবার নেয়।

এর সমাধান একটা কাগজ: নোটটা আলাদা রাখুন, নিজের চোখের সামনে। পর্দায় যা যাবে সেটা দর্শকের জন্য।

একটা স্লাইড, একটা কথা

এটাই মূল নিয়ম, আর বাকি সব নিয়ম এখান থেকেই আসে।

একটা স্লাইডে যদি দুটো কথা থাকে, দুটো স্লাইড বানান। স্লাইড সস্তা, মনোযোগ দামি।

শিরোনামটাই কথাটা বলবে:

দুর্বল: "বিক্রয় পর্যালোচনা"

ভালো: "ঈদের সপ্তাহে বিক্রি দ্বিগুণ হয়েছে"

প্রথমটা বলে স্লাইডটা কী নিয়ে। দ্বিতীয়টা বলে স্লাইডটা কী প্রমাণ করে। কেউ যদি শুধু শিরোনামগুলো পড়ে যান, দ্বিতীয় ধরনের প্রেজেন্টেশন থেকে তিনি পুরো গল্পটা পাবেন।

কতটুকু লেখা

একটা সহজ ছক মনে রাখুন: ছয় লাইনের বেশি নয়, প্রতি লাইনে ছয় শব্দের বেশি নয়।

মনে হতে পারে এত কম জায়গায় কথাগুলো ধরবে না। ধরার কথাও নয়। বাকিটা আপনি মুখে বলবেন, আর সেটাই তো আপনার সেখানে থাকার কারণ।

পুরো বাক্য লিখবেন না, কারণ পুরো বাক্য মানুষ পড়ে ফেলে। খণ্ড কথা লিখুন, যেটা আপনার কথার সাথে মিলে পূর্ণ হয়।

লেখার আকার অন্তত ২৪ পয়েন্ট। এর ছোট করতে হলে বুঝবেন লেখা বেশি হয়ে গেছে, তখন ফন্ট ছোট না করে লেখা কমান।

কোন স্লাইডটা আগে বানাবেন

শেষেরটা। যেটা শেষে থাকবে, সেটাই সবার আগে লিখুন।

কারণ ওই স্লাইডটাই আপনার আসল উদ্দেশ্য: শোনার পর মানুষ কী করবেন, বা কী মনে রাখবেন। ওটা ঠিক করা থাকলে বাকি স্লাইডগুলো নিজে থেকেই সাজানো সহজ হয়ে যায়, কারণ প্রতিটার একটাই কাজ, ওই শেষ কথাটার দিকে এগোনো।

আর যেটা ওই দিকে এগোয় না, সেটা বাদ দিন, যত সুন্দরই হোক।

গঠনটা

বেশিরভাগ প্রেজেন্টেশনে এই ক্রমটা কাজ করে:

  1. শিরোনাম স্লাইড: বিষয়, আপনার নাম, তারিখ
  2. কেন এই কথা: সমস্যা বা সুযোগটা এক স্লাইডে
  3. মূল কথা, তিন থেকে পাঁচটা স্লাইড, প্রতিটায় একটা কথা
  4. প্রমাণ: সংখ্যা, উদাহরণ বা ছবি
  5. তাই কী করব: সুপারিশ বা পরের ধাপ
  6. ধন্যবাদ আর যোগাযোগ

দশ মিনিটের জন্য দশটার বেশি স্লাইড লাগে না। এক মিনিটে একটা স্লাইড, এই হিসাবটা কাজ করে, তবে এটা নিয়ম নয়, আন্দাজ।

চার্ট আর ছবি

চার্ট: একটা চার্টে একটাই বার্তা। যে অংশটা মূল কথা সেটাতে রং দিন, বাকিটা ধূসর রাখুন। শিরোনামে সিদ্ধান্তটা লিখে দিন, অক্ষে একক লিখুন।

স্প্রেডশিট থেকে টেবিল কপি করে স্লাইডে বসাবেন না। টেবিল কাগজের জিনিস, পর্দার নয়। যদি টেবিল লাগেই, তাহলে যে ঘরটা মূল কথা সেটা রঙে আলাদা করে দিন।

ছবি: ভালো ছবি স্লাইডের অর্ধেক কাজ করে দেয়, আর খারাপ ছবি বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে। ঝাপসা ছবি, পুরোনো ক্লিপ-আর্ট আর জলছাপওয়ালা স্টক ছবি এড়িয়ে চলুন।

ছবি দিলে বড় করে দিন। ছোট ছবি কোণায় বসালে সেটা সাজসজ্জা, তথ্য নয়।

ফন্ট আর রং

দুইটার বেশি ফন্ট নয়। একটা শিরোনামের জন্য, একটা বাকি সবের জন্য। বাংলা প্রেজেন্টেশনে এমন ফন্ট বাছুন যেটা বড় আকারে পরিষ্কার দেখায়, আর যুক্তবর্ণগুলো একবার দেখে নিন।

রং: একটা প্রধান রং, একটা জোর দেওয়ার রং, আর সাদা বা হালকা ব্যাকগ্রাউন্ড। ঘরে প্রজেক্টর থাকলে গাঢ় ব্যাকগ্রাউন্ড এড়িয়ে চলুন, কারণ প্রজেক্টরের আলোয় গাঢ় রং ধূসর হয়ে যায় আর লেখা মিলিয়ে যায়।

সবচেয়ে জরুরি পরীক্ষাটা সহজ: স্লাইডটা নিজের ফোনে খুলে হাত দূরে নিয়ে দেখুন। ওভাবে পড়া না গেলে ঘরের শেষ সারি থেকেও যাবে না।

যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়

ভুলঘরে যা হয়
স্লাইড পড়ে শোনানোদর্শক শোনা বন্ধ করে দেন
প্রতি স্লাইডে ছয়-সাত পয়েন্টকোনটা জরুরি বোঝা যায় না
ফন্ট ছোট করে লেখা ঢোকানোপেছন থেকে পড়া যায় না
প্রতিটা লাইনে আলাদা অ্যানিমেশনসময় নষ্ট হয়, মনোযোগ ভাঙে
স্প্রেডশিটের টেবিল সরাসরিকেউ পড়েন না
শেষ স্লাইডে শুধু "ধন্যবাদ"সবচেয়ে দামি স্লাইডটা খালি যায়

শেষেরটা নিয়ে একটু বলা দরকার। প্রশ্নোত্তরের সময় শেষ স্লাইডটাই পর্দায় থাকে, প্রায়ই দশ মিনিট ধরে। ওখানে "ধন্যবাদ" না লিখে আপনার মূল কথাটা আর যোগাযোগের তথ্যটা রাখুন।

AI দিয়ে স্লাইড বানালে

গঠন আর খসড়ার কাজটা দ্রুত হয়ে যায়, তবে তিনটা কথা।

আগে বলুন কার জন্য আর কত মিনিট। এই দুটো না বললে সাধারণ একটা ডেক আসে। "শিক্ষকদের জন্য, দশ মিনিট, শেষে একটা সিদ্ধান্ত চাইতে হবে" এটুকু বললে অনেক কাজের জিনিস আসে।

সংখ্যাগুলো নিজে দিন। না জানলে যুক্তিসঙ্গত দেখতে সংখ্যা বসে যেতে পারে, আর সভায় ওটা নিয়েই প্রশ্ন আসবে। এটাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল বলে দেওয়ার সবচেয়ে সাধারণ জায়গা।

লেখা কমাতে বলুন। প্রথম খসড়ায় সাধারণত বেশি লেখা থাকে। "প্রতি স্লাইডে ছয় লাইনের বেশি নয়" বলে আরেকবার চালিয়ে নিন।

BanglaCodes-এর চ্যাটে লেখার বাক্সের নিচের "আরও" মেনুতে প্রেজেন্টেশন নামে একটা বাটন আছে। বিষয় আর কত মিনিট লিখে দিলে স্লাইডগুলো তৈরি হয়, আর PDF করে নামানো যায়।

বানানো একটা প্রেজেন্টেশন

কীভাবে গুছিয়ে বললে ভালো ফল আসে, সেটা আলাদা করে লেখা আছে ভালো prompt লেখার নিয়মে

প্রশ্নোত্তর

একটা প্রেজেন্টেশনে কতগুলো স্লাইড রাখব? মিনিটে একটা ধরে হিসাব করুন, তারপর কমান। দশ মিনিটের জন্য দশটার কাছাকাছি। সংখ্যাটা নিয়ম নয়, কিন্তু স্লাইড বেশি হলে প্রতিটায় সময় কমে যায় আর কোনোটাই মনে থাকে না।

স্লাইডে বাংলা লিখব না ইংরেজি? দর্শক যে ভাষায় স্বচ্ছন্দ। মিশিয়ে ফেলবেন না, বিশেষ করে এক স্লাইডের ভেতরে। কারিগরি শব্দ ইংরেজিতে রেখে বাকিটা বাংলায় লেখা স্বাভাবিক আর সেটা চলে।

নোট কোথায় রাখব? স্লাইডের নিচের নোটের ঘরে, বা হাতে একটা কাগজে। পর্দায় নয়। নোট থাকলে ভুলে যাওয়ার ভয় কমে, আর তখন স্লাইড খালি রাখতে সাহস হয়।

অ্যানিমেশন ব্যবহার করা যাবে? অল্প, আর একটাই ধরনের। এক এক করে পয়েন্ট আনা কাজে লাগে যখন আপনি চান না দর্শক আগেই পড়ে ফেলুক। ঘোরানো, লাফানো বা শব্দসহ অ্যানিমেশন মনোযোগ কাড়ে ঠিকই, কিন্তু কথা থেকে।

পর্দা ছোট বা প্রজেক্টর দুর্বল হলে? হালকা ব্যাকগ্রাউন্ড আর গাঢ় লেখা বাছুন, আর ফন্ট আরও বড় করুন। পাতলা ফন্ট এড়িয়ে চলুন, কারণ দুর্বল প্রজেক্টরে পাতলা অক্ষর মিলিয়ে যায়।

প্রেজেন্টেশন কি PDF করে পাঠানো ভালো? পাঠানোর জন্য PDF নিরাপদ, কারণ অন্যের কম্পিউটারে ফন্ট না থাকলেও সাজানো ঠিক থাকে। তবে যিনি পড়বেন শুধু, তাঁর জন্য স্লাইড নয়, দুই পাতার একটা নোট বেশি কাজে দেয়।

শেষ স্লাইডে কী রাখব? আপনার মূল কথাটা এক লাইনে, পরের ধাপ, আর যোগাযোগ। প্রশ্নোত্তরের পুরো সময়টা এই স্লাইডটাই পর্দায় থাকে, তাই এটাই সবচেয়ে বেশি দেখা স্লাইড।

AI দিয়ে বানানো স্লাইড কি বোঝা যায়? সব স্লাইড একই ছাঁচের হলে আর প্রতিটায় সমান তিনটা করে পয়েন্ট থাকলে চোখে পড়ে। খসড়াটা নিয়ে নিজের উদাহরণ আর নিজের সংখ্যা বসিয়ে দিলে সেটা আর থাকে না।

সংক্ষেপে