প্রতিবেদন লেখার নিয়ম, পরীক্ষার আর অফিসের দুইটা আলাদা ছক

এক শব্দ, দুইটা আলাদা কাগজ

"প্রতিবেদন লেখার নিয়ম" খুঁজলে দুই রকম মানুষ খোঁজেন।

একজন পরীক্ষার্থী, যাঁর খাতায় একটা সংবাদ প্রতিবেদন লিখতে হবে, আর যাঁর নম্বর নির্ভর করে একটা নির্দিষ্ট ছক মেনে চলার উপর।

আরেকজন চাকরিজীবী, যাঁকে অফিসে মাসের হিসাব বা একটা ঘটনার বিবরণ জমা দিতে হবে, আর যাঁর কাগজটা পড়বেন এমন একজন যাঁর হাতে সময় নেই।

দুটোর ছক আলাদা, আর একটার নিয়ম আরেকটায় লাগালে দুটোই খারাপ হয়। তাই আগে ঠিক করে নিন আপনি কোনটা লিখছেন।

পরীক্ষার সংবাদ প্রতিবেদন

খাতার প্রতিবেদনে কাঠামোটাই মূল নম্বর, আর কাঠামোটা চেনা।

অংশকী থাকে
শিরোনামঘটনার সারকথা, ছোট আর নির্দিষ্ট
প্রতিবেদকের পরিচয়নিজস্ব প্রতিবেদক বা নাম, স্থান আর তারিখ
সূচনাপ্রথম অনুচ্ছেদেই ঘটনার মূল কথা
বিবরণকী ঘটেছে, কোথায়, কখন, কীভাবে, কারা জড়িত
বক্তব্যসংশ্লিষ্ট কারও উদ্ধৃতি, থাকলে
উপসংহারপরিস্থিতি এখন কী, বা কী দরকার
প্রেরক ও প্রাপকনিচে বাঁয়ে প্রেরকের নাম ও ঠিকানা, ডানে প্রাপক

প্রথম অনুচ্ছেদটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকতার নিয়মে ওখানেই ঘটনার মূল কথাটা থাকে, আর বাকি অনুচ্ছেদগুলো ক্রমে কম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে আসে। এই সাজানোটাকে বলে উল্টানো পিরামিড, আর খাতাতেও এটাই প্রত্যাশিত।

যেখানে নম্বর কাটা যায়:

  1. শিরোনাম নেই বা এত সাধারণ যে ঘটনাটাই বোঝা যায় না
  2. প্রতিবেদকের পরিচয়, স্থান আর তারিখের অংশটা বাদ পড়া
  3. প্রথম অনুচ্ছেদে ভূমিকা দিয়ে শুরু করা, মূল কথা তিন নম্বর অনুচ্ছেদে
  4. প্রেরক ও প্রাপকের অংশ না লেখা
  5. নিজের মতামত মিশিয়ে ফেলা, যেটা সংবাদ প্রতিবেদনে থাকে না

শেষেরটা অনেকে করেন। প্রতিবেদন ঘটনা জানায়, বিচার করে না। "এটি অত্যন্ত দুঃখজনক" এই বাক্যটা প্রতিবেদনের নয়, সম্পাদকীয়র।

অফিসের প্রতিবেদন

এখানে ছকটা বদলায়, কারণ পাঠকও বদলায়। খাতায় পরীক্ষক পুরোটা পড়েন। অফিসে যিনি পড়বেন তিনি প্রথম পাতা পড়ে সিদ্ধান্ত নিতে চান।

ক্রমটা সাধারণত এরকম:

  1. কভার: শিরোনাম, তারিখ, কে লিখেছেন, কোন সংস্করণ
  2. নির্বাহী সারসংক্ষেপ, এক পাতা
  3. সূচি, প্রতিবেদন পাঁচ পাতার বেশি হলে
  4. ভূমিকা আর পরিধি: কী দেখা হয়েছে, কী দেখা হয়নি
  5. ফলাফল
  6. সুপারিশ
  7. পরিশিষ্ট: পদ্ধতি, বিস্তারিত টেবিল, উৎস

মূল অংশটা পনেরো পাতার ভেতরে রাখুন, বাকিটা পরিশিষ্টে। যেটা পড়া হবে না সেটা মাঝখানে রাখলে যেটা পড়া দরকার সেটাও পড়া হয় না।

সারসংক্ষেপটা লিখবেন সবার শেষে

নাম শুনে মনে হয় এটা শুরুর জিনিস, কিন্তু লেখা হয় সবার পরে। কারণ যা এখনো লেখেননি তার সারসংক্ষেপ হয় না।

এক পাতায়, তিনশো শব্দের মধ্যে, তিনটা জিনিস:

পরীক্ষা করার সহজ উপায়: কেউ যদি শুধু এই এক পাতা পড়ে থেমে যান, তিনি কি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন? পারলে সারসংক্ষেপটা কাজ করছে।

আর এখানে যা লিখবেন না: প্রতিবেদনের গঠনের বর্ণনা। "এই প্রতিবেদনের প্রথম অংশে আলোচনা করা হয়েছে" ধরনের বাক্য পাঠকের কোনো কাজে আসে না, শুধু জায়গা নেয়।

শিরোনামটাই বার্তা

এটা একটা ছোট বদল যেটা পুরো প্রতিবেদনের মান বদলে দেয়।

দুর্বল শিরোনাম: "বিক্রয় বিশ্লেষণ"

ভালো শিরোনাম: "দাম বাড়ানোর পর ক্রেতা ফেরার হার অর্ধেকে নেমেছে"

প্রথমটা বলে অংশটা কী নিয়ে। দ্বিতীয়টা বলে অংশটা কী প্রমাণ করে। কেউ যদি শুধু শিরোনামগুলো পড়ে যান, দ্বিতীয় ধরনের প্রতিবেদন থেকে তিনি পুরো গল্পটা পেয়ে যাবেন।

একই নিয়ম প্রতিটা পাতার প্রথম বাক্যে। এক পাতায় একটাই মূল কথা রাখুন।

সংখ্যা, টেবিল আর চার্ট

সংখ্যা: লেখার ভেতরে গোল করে লিখুন, টেবিলে হুবহু। আর সব সময় একটা তুলনার সাথে দিন, যেমন আগের মাস বা লক্ষ্যমাত্রা। একা দাঁড়ানো সংখ্যা কিছু বলে না; "গত মাসের চেয়ে দ্বিগুণ" বলে।

বাংলা সংখ্যা লিখবেন না ইংরেজি, সেটা একবার ঠিক করে পুরো প্রতিবেদনে এক রাখুন। মাঝপথে বদলালে চোখে লাগে।

টেবিল: সংখ্যাগুলো ডান দিকে সাজানো, দশমিকের ঘর সমান, একক শিরোনামে একবার, মোটের সারিটা মোটা অক্ষরে।

চার্ট: একটা চার্টে একটাই বার্তা। শিরোনামে সিদ্ধান্তটা লিখে দিন, অক্ষে একক লিখুন, নিচে উৎস দিন। ত্রিমাত্রিক চার্ট, চার ভাগের বেশি পাই আর দুই অক্ষের চার্ট এড়িয়ে চলুন। যে অংশটা মূল কথা সেটাতে রং দিন, বাকিটা ধূসর রাখুন।

সুপারিশ যেভাবে লিখলে কাজ হয়

সুপারিশের অংশে সবচেয়ে বেশি যে বাক্যটা লেখা হয়, সেটাই সবচেয়ে অকেজো: "এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।"

কাজের সুপারিশে চারটা জিনিস থাকে: প্রথম শব্দটা একটা ক্রিয়া, কত খরচ বা শ্রম লাগবে, কী ফল আশা করা হচ্ছে, আর কে কবের মধ্যে করবেন।

দুর্বল: "গ্রাহক সেবার মান উন্নত করা প্রয়োজন।"

ভালো: "কল সেন্টারে দুইজন যোগ করুন, আগামী মাসের এক তারিখ থেকে; লক্ষ্য অভিযোগ নিষ্পত্তির সময় দুই দিন থেকে এক দিনে নামানো। দায়িত্ব: অপারেশনস।"

নম্বর দিয়ে লিখুন, আর সবচেয়ে জরুরিটা আগে।

পরিধির অংশটা বাদ দিবেন না

ভূমিকার সাথে এক লাইনে লিখে দিন কী দেখা হয়েছে আর কী দেখা হয়নি, আর তথ্যটা কোন সময়ের।

এটা আত্মরক্ষার জন্য নয়, পাঠকের জন্য। যিনি পড়বেন তিনি যেন ভুল করে এমন সিদ্ধান্ত না নেন যেটা এই তথ্য দিয়ে নেওয়া যায় না। কোন তারিখে তথ্য নেওয়া হয়েছে সেটাও লিখে দিন, কারণ তিন মাস পর কেউ এই প্রতিবেদন পড়লে সেটা জানা দরকার।

AI দিয়ে প্রতিবেদন লিখলে

কাঠামো আর ভাষার কাজটা AI ভালো করে, কিন্তু তিনটা জায়গায় সতর্ক থাকতে হয়।

প্রথম, তথ্যটা আপনার দিতে হবে। সংখ্যা না দিলে সে যুক্তিসঙ্গত দেখতে সংখ্যা বসিয়ে দিতে পারে, আর প্রতিবেদনে একটা বানানো সংখ্যা সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিস। এটাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল বলে দেওয়ার সবচেয়ে সাধারণ জায়গা। নিজের হিসাবটা পেস্ট করে দিন, তারপর লিখতে বলুন।

দ্বিতীয়, কোন ছক চান বলে দিন। "প্রতিবেদন লিখে দাও" বললে সাধারণত অফিসের ছকটা আসে। পরীক্ষার জন্য হলে "সংবাদ প্রতিবেদন, প্রেরক ও প্রাপকসহ" লিখে দিন।

তৃতীয়, সারসংক্ষেপটা নিজে পড়ুন। ওই এক পাতাই বেশিরভাগ পাঠক পড়বেন, তাই ওখানে ভুল থাকলে বাকি পনেরো পাতা কিছু বাঁচাতে পারবে না।

BanglaCodes-এর চ্যাটে হিসাবটা দিয়ে প্রতিবেদন চাইলে টেবিল আর চার্টসহ একটা পুরো প্রতিবেদন তৈরি হয়, আর PDF করে নামানো যায়।

চার্টসহ বানানো একটা রিপোর্ট

ভালো করে বলার নিয়মটা আলাদা করে লেখা আছে ভালো prompt লেখার নিয়মে

প্রশ্নোত্তর

প্রতিবেদন কত বড় হওয়া উচিত? পরীক্ষার খাতায় প্রশ্নে যা বলা আছে, সাধারণত এক পাতার কাছাকাছি। অফিসের প্রতিবেদনে মূল অংশ পনেরো পাতার ভেতরে, আর যা এর বাইরে দরকার সেটা পরিশিষ্টে। লম্বা প্রতিবেদন মনোযোগ পায় না, পড়ে থাকে।

সারসংক্ষেপ আর ভূমিকা কি এক জিনিস? না। ভূমিকা বলে প্রতিবেদনটা কী নিয়ে আর কী কী দেখা হয়েছে। সারসংক্ষেপ বলে ফলাফল আর সিদ্ধান্তটা কী। সারসংক্ষেপ পড়ে থেমে গেলেও কাজ চলে যাওয়ার কথা, ভূমিকা পড়ে থামলে কিছুই জানা হয় না।

সংবাদ প্রতিবেদনে নিজের মতামত দেওয়া যায়? না। সংবাদ প্রতিবেদন ঘটনা জানায়, বিচার করে না। মূল্যায়ন দরকার হলে সেটা কারও উদ্ধৃতি হিসেবে আসতে পারে, নিজের বাক্য হিসেবে নয়।

বাংলা না ইংরেজি সংখ্যা লিখব? যেকোনো একটা, কিন্তু পুরো প্রতিবেদনে এক। মাঝপথে বদলালে সেটা অগোছালো দেখায়, আর টেবিলের সাথে লেখার সংখ্যা না মিললে পাঠক থেমে যান।

উৎস কীভাবে লিখব? প্রতিটা টেবিল আর চার্টের নিচে ছোট করে উৎস আর তথ্য নেওয়ার তারিখ। প্রতিবেদনের শেষে একটা তালিকা রাখলে আরও ভালো। উৎস ছাড়া সংখ্যা মানে পাঠককে বিশ্বাস করতে বলা, আর যিনি সিদ্ধান্ত নিবেন তিনি সেটা করেন না।

খারাপ ফল পাওয়া গেলে সেটাও লিখব? লিখবেন, আর সেটাই প্রতিবেদনের কাজ। যে প্রতিবেদনে শুধু ভালো খবর থাকে, দ্বিতীয়বার সেটাকে কেউ বিশ্বাস করে না। খারাপ ফলের সাথে কারণ আর একটা সুপারিশ দিলে সেটা অভিযোগ নয়, কাজ হয়ে যায়।

একই প্রতিবেদন প্রতি মাসে দিতে হলে? ছকটা একবার বানিয়ে সেটাই ব্যবহার করুন, শুধু সংখ্যা আর সারসংক্ষেপ বদলাবে। মাসে মাসে সাজানো এক থাকলে পাঠক তুলনা করতে পারেন, আর সেটাই নিয়মিত প্রতিবেদনের আসল দাম।

AI দিয়ে লেখা প্রতিবেদন কি ধরা পড়ে? ভাষা অতিরিক্ত গোছানো হলে বা প্রতিটা অনুচ্ছেদ একই দৈর্ঘ্যের হলে চোখে পড়ে। বড় সমস্যা অন্যখানে: সংখ্যাগুলো যদি আপনার নিজের না হয়, সভায় প্রশ্ন উঠলে উত্তর দিতে পারবেন না।

সংক্ষেপে