দরখাস্ত লেখার নিয়ম, ছয়টা অংশ আর একটা পূর্ণ নমুনা

একটা কাগজ, যেটা সবাইকে অন্তত একবার লিখতে হয়

স্কুলে ছুটির দরখাস্ত। অফিসে ছুটির আবেদন। ব্যাংকে অ্যাকাউন্টের তথ্য বদলানোর অনুরোধ। বিদ্যুৎ অফিসে মিটার নিয়ে অভিযোগ।

চার জায়গায় চার রকম কথা, কিন্তু কাগজটার চেহারা এক। এই এক চেহারাটা একবার মাথায় ঢুকে গেলে বাকি জীবন আর কারও কাছে জিজ্ঞেস করতে হয় না।

বেশিরভাগ মানুষ আটকান দুই জায়গায়। এক, কোন অংশটা আগে আর কোনটা পরে। দুই, মূল কথাটা কত বড় হবে। প্রথমটার উত্তর একটা তালিকা, দ্বিতীয়টার উত্তর এক লাইনে: যত ছোট, তত ভালো।

ছয়টা অংশ, প্রতিটার আলাদা কাজ

একটা দরখাস্তে ছয়টা অংশ থাকে, আর ক্রমটা বদলায় না।

অংশকোথায় বসেকাজটা কী
তারিখএকদম উপরে, বাঁয়েকবে দিলেন সেটার প্রমাণ
প্রাপকের পরিচয়তারিখের নিচেকার কাছে যাচ্ছে, তাঁর পদবি আর ঠিকানা
বিষয়সম্বোধনের ঠিক আগেএক লাইনে পুরো অনুরোধটা
সম্বোধনবিষয়ের নিচেজনাব, স্যার বা ম্যাডাম
মূল বক্তব্যমাঝখানেকারণ, সময়কাল, অনুরোধ
নিবেদকের অংশনিচে ডানে বা বাঁয়েস্বাক্ষর, নাম, শ্রেণি বা পদ, রোল বা আইডি

এর মধ্যে যেটা সবচেয়ে বেশি বাদ পড়ে সেটা হলো বিষয়। অথচ যিনি দিনে চল্লিশটা দরখাস্ত দেখেন, তিনি ওই এক লাইনটাই আগে পড়েন। বিষয় না থাকলে পুরো কাগজটা পড়ে বুঝতে হয় ব্যাপারটা কী, আর সেটা কেউ করতে চান না।

বিষয়ের লাইনটা যেভাবে লিখলে কাজ হয়

ভুল: বিষয়: ছুটির জন্য আবেদন।

ঠিক: বিষয়: তিন দিনের অসুস্থতাজনিত ছুটির জন্য আবেদন।

পার্থক্যটা হলো সংখ্যা আর কারণ। প্রথমটা পড়ে এখনো জানতে হয় কত দিন, কেন। দ্বিতীয়টা পড়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

একই নিয়ম সব ক্ষেত্রে খাটে:

একটা পূর্ণ নমুনা: স্কুলে ছুটির দরখাস্ত

নিচেরটা হুবহু কপি করার জন্য নয়, ছাঁচটা দেখার জন্য। নাম, তারিখ আর কারণ নিজেরটা বসিয়ে নিবেন।

১. তারিখ, একদম উপরে, বাঁ পাশে:

৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

২. প্রাপকের পরিচয়, প্রতিটা আলাদা লাইনে, একটার নিচে একটা:

বরাবর প্রধান শিক্ষক আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মিরপুর, ঢাকা

৩. বিষয়, মোটা অক্ষরে বা নিচে দাগ দিয়ে:

বিষয়: তিন দিনের অসুস্থতাজনিত ছুটির জন্য আবেদন।

৪. সম্বোধন:

জনাব,

৫. মূল বক্তব্য, দুই অনুচ্ছেদ:

যথাবিহিত সম্মান প্রদর্শনপূর্বক জানাচ্ছি যে, আমি আপনার বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির একজন নিয়মিত ছাত্র। গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে আমি জ্বরে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী আছি। ডাক্তার আমাকে তিন দিন সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
এমতাবস্থায়, ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন দিনের ছুটি মঞ্জুর করে আমাকে বাধিত করবেন। ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্রের একটি অনুলিপি সাথে সংযুক্ত করা হলো।

৬. নিবেদকের অংশ, প্রতিটা আলাদা লাইনে:

বিনীত নিবেদক আপনার একান্ত অনুগত ছাত্র মোঃ রফিকুল ইসলাম শ্রেণি: নবম, শাখা: ক রোল: ১৪

লক্ষ করুন, মূল বক্তব্য দুই অনুচ্ছেদ। প্রথমটায় পরিচয় আর কারণ, দ্বিতীয়টায় ঠিক কত তারিখ থেকে কত তারিখ আর অনুরোধ। তিন নম্বর অনুচ্ছেদের দরকার পড়েনি, কারণ বলার মতো আর কিছু ছিল না।

অফিসের দরখাস্তে যা বদলায়

কাঠামো একই থাকে, তিনটা জিনিস বদলায়।

সম্বোধন আর ভাষা একটু কম আনুষ্ঠানিক। "যথাবিহিত সম্মান প্রদর্শনপূর্বক" স্কুল আর সরকারি দপ্তরের রীতি। বেসরকারি অফিসে সরাসরি "জনাব, আমি ... বিভাগে কর্মরত আছি" দিয়ে শুরু করাই স্বাভাবিক।

পদবি আর কর্মচারী আইডি যোগ হয়। নিচের অংশে নামের সাথে পদবি, বিভাগ আর আইডি নম্বর থাকে, যাতে খাতায় খুঁজে পেতে সহজ হয়।

দায়িত্ব হস্তান্তরের লাইনটা যোগ করতে হয়। এটাই সবচেয়ে বেশি বাদ পড়ে, অথচ ছুটি মঞ্জুর হওয়া না হওয়া অনেক সময় এর উপরই ঝুলে থাকে। এক লাইনে লিখে দিন আপনার অনুপস্থিতিতে কাজটা কে দেখবেন, আর তাঁর সাথে কথা হয়েছে কি না।

যে ভুলগুলো সবচেয়ে বেশি হয়

ভুলকেন সমস্যাবদলে যা করবেন
এক দরখাস্তে দুই অনুরোধএকটা মঞ্জুর হয়, আরেকটা হারিয়ে যায়দুটো আলাদা কাগজ
তারিখ না লেখাকবে দিয়েছেন প্রমাণ থাকে নাসব সময় উপরে তারিখ
"যত দ্রুত সম্ভব"কেউ জানে না কবে দরকারনির্দিষ্ট তারিখ লিখুন
লম্বা ভূমিকাআসল কথা তিন নম্বর অনুচ্ছেদে চলে যায়প্রথম বাক্যেই কারণ
আবেগের বর্ণনাসিদ্ধান্ত নেওয়ার কাজে লাগে নাঘটনাটা লিখুন, অনুভূতিটা নয়
সংযুক্তির কথা না লেখাকাগজ খুলে পড়ে যায়, কেউ জোড়া দেয় নাশেষে "সংযুক্ত: ..." লিখুন

শেষেরটা নিয়ে একটু বলা দরকার। ডাক্তারের কাগজ, পরীক্ষার ফলের কপি বা আগের চিঠির নকল সাথে দিলে দরখাস্তের ভেতরেই লিখে দিন কী কী দিচ্ছেন। কাগজ আলাদা হয়ে গেলে তখন অন্তত লেখা থাকে যে ওটা ছিল।

হাতে লিখব না কম্পিউটারে

স্কুলের ছুটির দরখাস্ত সাধারণত হাতে লেখা হয়, আর সেটাই স্বাভাবিক। পরীক্ষার খাতায় তো হাতে ছাড়া উপায়ই নেই।

অফিস, ব্যাংক বা সরকারি দপ্তরে কম্পিউটারে লিখে ছাপিয়ে নেওয়াই ভালো, দুটো কারণে। এক, নিজের কাছে একটা কপি থেকে যায়। দুই, একই দরখাস্ত পরের বার আবার লাগলে তারিখটা বদলে দিলেই হয়।

হাতে লিখলে তিনটা জিনিস মাথায় রাখুন: এক পাতার বেশি নয়, বাঁ দিকে অন্তত এক ইঞ্চি ফাঁকা রাখুন, আর কাটাকাটি হলে নতুন কাগজে লিখুন। কাটাকাটি করা দরখাস্ত পড়ার আগেই একটা ধারণা তৈরি করে দেয়।

পরীক্ষার খাতায় দরখাস্ত

বাংলাদেশে দরখাস্ত শুধু কাজের কাগজ নয়, পরীক্ষার প্রশ্নও। আর পরীক্ষায় নম্বর কাটা যায় সাধারণত কাঠামোতে, ভাষায় নয়।

যেখানে নম্বর যায়:

  1. বিষয়ের লাইন বাদ পড়া বা অস্পষ্ট হওয়া
  2. প্রাপকের ঠিকানা অসম্পূর্ণ, যেমন প্রতিষ্ঠানের নাম আছে কিন্তু এলাকা নেই
  3. নিবেদকের অংশে শ্রেণি বা রোল না লেখা
  4. তারিখ না থাকা
  5. এক পাতার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া

মুখস্থ করার দরকার নেই। ছয়টা অংশ ক্রম মেনে বসাতে পারলে কাঠামোর নম্বর পুরোটাই থাকে, আর ভাষা সহজ হলে বাকিটা এমনিতেই আসে।

AI দিয়ে লিখিয়ে নিলে যা মাথায় রাখবেন

এখন অনেকেই ChatGPT বা এই ধরনের কোনো সহকারীকে দিয়ে দরখাস্তটা লিখিয়ে নেন। কাজটা ভালোই হয়, তবে তিনটা সতর্কতা আছে।

প্রথম, নিজের তথ্য নিজে বসান। AI নাম, রোল, তারিখ বা প্রতিষ্ঠানের নাম না জানলে অনুমান করে বসিয়ে দেয়, আর ওটাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল বলে দেওয়ার সবচেয়ে সাধারণ জায়গা। লেখা শেষ হলে সংখ্যাগুলো নিজে মিলিয়ে নিন।

দ্বিতীয়, কী চান সেটা গুছিয়ে বলুন। "ছুটির দরখাস্ত লিখে দাও" বললে সাধারণ একটা কাগজ পাবেন। কার কাছে, কোন প্রতিষ্ঠানে, কত তারিখ থেকে কত তারিখ, কারণ কী, সংযুক্তি আছে কি না, এটুকু বললে যেটা আসে সেটা সরাসরি ছাপানোর মতো। কীভাবে গুছিয়ে বলবেন সেটা আলাদা করে লেখা আছে ভালো prompt লেখার নিয়মে

তৃতীয়, ভাষাটা নিজের রাখুন। খুব কেতাদুরস্ত বাংলা এসে গেলে বদলে দিন। যিনি পড়বেন তিনি আপনাকে চেনেন, আর হঠাৎ বদলে যাওয়া ভাষা চোখে পড়ে।

BanglaCodes-এর চ্যাটে লেখার বাক্সের নিচের "আরও" মেনুতে আবেদনপত্র নামে একটা বাটন আছে। ওটায় চাপলে বাংলা আর ইংরেজি দুটোতেই একটা দরখাস্ত তৈরি হয়, উপরের ছয়টা অংশ ধরেই, আর PDF করে নামিয়ে নেওয়া যায়। ফ্রি Model-এই কাজটা হয়, আলাদা খরচ নেই।

প্রশ্নোত্তর

দরখাস্ত আর আবেদনপত্র কি আলাদা জিনিস? কাগজটা এক, নামটা দুই রকম। দরখাস্ত শব্দটা স্কুল আর দৈনন্দিন কথায় বেশি চলে, আবেদনপত্র একটু আনুষ্ঠানিক জায়গায়। ইংরেজিতে দুটোই application। কাঠামোতে কোনো পার্থক্য নেই।

দরখাস্ত কি বাংলায় লিখব না ইংরেজিতে? যে প্রতিষ্ঠান যে ভাষায় চিঠি চালাচালি করে, সেই ভাষায়। বাংলা মাধ্যমের স্কুল, সরকারি দপ্তর আর বেশিরভাগ স্থানীয় অফিসে বাংলা স্বাভাবিক। বহুজাতিক অফিস বা যেখানে নিয়োগপত্র ইংরেজিতে হয়েছে, সেখানে ইংরেজি। সন্দেহ হলে আগে যে চিঠি পেয়েছেন তার ভাষাটা দেখুন।

"যথাবিহিত সম্মান প্রদর্শনপূর্বক" কি লিখতেই হবে? বাধ্যতামূলক নয়, তবে স্কুল আর সরকারি দপ্তরের চেনা রীতি, আর পরীক্ষার খাতায় এটাই প্রত্যাশিত। লিখলে ওই এক লাইনই যথেষ্ট, তারপর সাদামাটা ভাষায় চলে যান। পুরো দরখাস্ত জুড়ে ভারী শব্দ বসালে পড়তে কষ্ট হয়।

দরখাস্ত কত বড় হওয়া উচিত? এক পাতা, আর মূল বক্তব্য দুই থেকে তিন অনুচ্ছেদ। যিনি পড়বেন তাঁর টেবিলে আরও অনেক কাগজ আছে। ছোট দরখাস্ত অভদ্র নয়, বরং এটাই ভদ্রতা।

একসাথে দুটো অনুরোধ করা যায়? এড়িয়ে চলুন। এক দরখাস্তে এক বিষয়, কারণ দুটো অনুরোধ সাধারণত দুই জায়গায় দুইজনের কাছে যায়। একটা মঞ্জুর হয়ে যায়, আরেকটা কোথাও পড়ে থাকে, আর আপনি জানতেও পারেন না কোনটা।

ছুটির দরখাস্ত কত আগে দিতে হয়? আগে থেকে জানা থাকলে যত আগে সম্ভব, অন্তত এক সপ্তাহ। হঠাৎ অসুস্থতা বা জরুরি কারণে আগে জানানোর উপায় না থাকলে ফোনে বা মেসেজে জানিয়ে রাখুন, আর কাগজটা ফেরার দিন জমা দিন। কাগজে সেই কথাটাও এক লাইনে লিখে দিন।

হাতে লেখা দরখাস্তে ভুল হয়ে গেলে কেটে ঠিক করা যায়? এক-দুই জায়গায় ছোট কাটা কেউ ধরবে না, কিন্তু তিনটার বেশি হলে নতুন কাগজে লিখে ফেলুন। বিশেষ করে তারিখ, নাম বা সংখ্যায় কাটাকাটি এড়ানো ভালো, কারণ ওগুলোই পরে প্রমাণ হিসেবে লাগে।

চাকরির আবেদনের সাথে কি সিভিও লাগে? লাগে, আর দুটো আলাদা কাজ করে। চিঠিটা বলে আপনি কোন পদের জন্য লিখছেন আর কেন আপনি মানানসই, সিভিটা বলে আপনি কী কী করেছেন। চিঠিতে সিভির কথাগুলো আবার লিখবেন না। সিভির ছক আর অংশগুলো আলাদা করে লেখা আছে সিভি লেখার নিয়মে

AI দিয়ে লেখা দরখাস্ত কি কেউ ধরতে পারে? ভাষা হঠাৎ বদলে গেলে বা অতিরিক্ত গোছানো হলে চোখে পড়ে, বিশেষ করে যিনি আপনার আগের লেখা দেখেছেন। এটা এড়ানোর সহজ উপায় হলো কাঠামোটা AI-এর কাছ থেকে নেওয়া আর কারণের অংশটা নিজের ভাষায় লিখে দেওয়া।

সংক্ষেপে