ওয়েবসাইট বানানোর নিয়ম: কোডিং না জেনে, ধাপে ধাপে

নাসির উদ্দিন শামীমপ্রতিষ্ঠাতা, BanglaCodes.Com

১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · ১৬ মিনিটের পড়া · ওয়েবসাইট, AI

এক নজরে উত্তর

কোডিং না জেনে AI দিয়ে ওয়েবসাইট বানানো যায় কি, আর কোন ধাপে শুরু করবেন?

হ্যাঁ, যায়। ছোট ব্যবসার পরিচিতি সাইট, পোর্টফোলিও, রেস্টুরেন্টের মেনু বা প্রোডাক্টের লিস্টের মতো সাইট এখন AI দিয়ে কোড না লিখেই বানানো সম্ভব। তবে লেখা, দাম আর ছবি আপনাকেই দিতে হবে, আর অর্ডার নেওয়া বা অনলাইন পেমেন্টের জন্য বাড়তি ব্যবস্থা লাগে। শুরুটা হয় সাইট কী কাজ করবে সেটা ঠিক করে, তারপর আসল লেখা আর ছবি জোগাড় করে।

সোজা উত্তরটা আগে

হ্যাঁ, কোডিং না জেনে ওয়েবসাইট বানানো যায়, আর এটা কোনো ভবিষ্যতের কথা নয়, আজকের কথা।

বাংলায় বলে বানানো একটা সাইট, বিল্ডারে খোলা

তবে বাক্যটা এখানেই শেষ হয় না। AI আসার পর যা বদলেছে তা হলো, কোড লেখা আর প্রধান বাধা নয়। আগে সবচেয়ে কঠিন অংশ ছিল HTML আর CSS শেখা। এখন সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো আপনি ঠিক কী চান সেটা পরিষ্কার করে বলতে পারা, আর সাইটে দেওয়ার মতো আসল লেখা ও ছবি জোগাড় করা।

অনেকে AI বিল্ডার খুলে দশ মিনিটে সুন্দর একটা সাইট পেয়ে যান, তারপর আটকে যান, কারণ সাইটে বসানোর মতো প্রোডাক্টের ছবি নেই, দামের লিস্ট ঠিক নেই, আর কী মেসেজ দিতে চান সেটাও ঠিক করা হয়নি। বাধাটা কারিগরি ছিল না, বাধাটা প্রস্তুতির।

তাই এই লেখাটা তিনটা প্রশ্নের সৎ উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবে: AI আজ সত্যিই কী পারে, কোন কাজটা এখনো মানুষের, আর অনলাইনে একটা সাইট রাখতে বছরে আসলে কত টাকা যায়।

AI দিয়ে ওয়েবসাইট বানানো: আজ সত্যিই যা পারে

সৎভাবে বললে, এই কাজগুলো এখন ভালোভাবেই হয়:

  • এক পেজের পরিচিতি সাইট, দোকান, ক্লিনিক, কোচিং সেন্টার বা প্রতিষ্ঠানের জন্য
  • পোর্টফোলিও, ফ্রিল্যান্সার, ছাত্র বা চাকরিপ্রার্থীর জন্য
  • রেস্টুরেন্টের মেনু বা দামের লিস্ট, QR কোড দিয়ে টেবিলে দেখানোর মতো
  • প্রোডাক্টের ক্যাটালগ, ছবি আর দাম সহ, অর্ডার যায় WhatsApp-এ
  • লিংক ইন বায়ো পেজ, ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামের বায়োতে দেওয়ার জন্য
  • ইভেন্ট বা ভর্তির তথ্যের পেজ
  • মোবাইলে ঠিকঠাক দেখানো, এটা এখন প্রায় নিজে থেকেই হয়ে যায়

এসব ক্ষেত্রে ফল অনেক সময় গড়পড়তা টেমপ্লেটের চেয়ে ভালো হয়, কারণ আপনার নিজের কথা দিয়ে সাজানো।

আরেকটা জিনিস AI এখন ভালো পারে, আর সেটা কম আলোচিত: বদলানো। "ফোন নম্বরটা বড় করো", "উপরে একটা WhatsApp বাটন বসাও", "রংটা সবুজ করো", এই ধরনের রিকোয়েস্টে সে সাথে সাথে বদলে দেয়। আগে প্রতিটা ছোট বদলের জন্য ডেভেলপারকে ফোন করতে হতো আর অপেক্ষা করতে হতো। এই একটা পরিবর্তন ছোট ব্যবসার জন্য সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা।

যা এখনো মানুষকেই করতে হয়

এই অংশটা কেউ বিজ্ঞাপনে বলে না, তাই এখানে বলে রাখি:

  • আসল লেখা আর ছবি। না দিলে AI কাল্পনিক লেখা বসাবে, আর সেই সাইট ছাপার অক্ষরে সুন্দর হলেও কাজের নয়
  • সিদ্ধান্ত। সাইটে ঢুকে ভিজিটর কী করবে, ফোন করবে, WhatsApp-এ লিখবে, নাকি অর্ডার দিবে, এটা আপনার ব্যবসার সিদ্ধান্ত
  • ফর্ম সত্যিই কাজ করা। এটা নিয়ে নিচে আলাদা অংশ আছে, কারণ এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি
  • অনলাইন পেমেন্ট। গেটওয়ে চালু করতে সাধারণত ট্রেড লাইসেন্স, TIN আর ব্যাংক অ্যাকাউন্টসহ কাগজপত্র লাগে এবং অনুমোদনে সময় যায়। এটা কোডের সমস্যা নয়, কাগজের কাজ, AI এখানে কিছু করতে পারবে না
  • নিয়মিত হালনাগাদ। দাম বদলালে সাইটেও বদলাতে হবে, নয়তো ক্রেতা পুরনো দাম দেখে ফোন করবেন
  • আসল ফোনে পরীক্ষা। কম্পিউটারে যা নিখুঁত, ছোট ফোনে তা ভেঙে যেতে পারে; নিজের ফোনে খুলে দেখুন
  • বাংলা ফন্ট আর যুক্তাক্ষর। কিছু ফন্টে যুক্তাক্ষর ভেঙে যায়, চোখে দেখে ভেরিফাই করা ছাড়া উপায় নেই
  • ডোমেইনের নবায়ন মনে রাখা। এটা কারিগরি কাজ নয়, ক্যালেন্ডারের কাজ, আর সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা এখানেই ঘটে

চারটা বাস্তব দরকার, চার রকম সাইট

"ওয়েবসাইট" বলতে সবার একই জিনিস দরকার হয় না। চারজনের উদাহরণ দেখুন, তাহলে নিজেরটা চিনতে সহজ হবে।

কারআসলে কী দরকারকতটুকু কাজকী দরকার নেই
খুলনার হার্ডওয়্যার দোকানপ্রোডাক্টের ক্যাটালগ, দাম, ঠিকানা, ম্যাপ, WhatsApp বাটনএক পেজ, ছবি আর দামের লিস্টঅনলাইন পেমেন্ট, লগইন, কার্ট
কুমিল্লার ফার্মেসিখোলার সময়, ঠিকানা, ফোন, হোম ডেলিভারির নিয়মএক পেজ, খুব সাধারণওষুধের অনলাইন অর্ডার, নিয়ন্ত্রক জটিলতা আছে
ঢাকার ফ্রিল্যান্সারআগের কাজের নমুনা, সার্ভিসের লিস্ট, যোগাযোগের পথএক পেজ, তবে ছবি আর নমুনা লাগবেব্লগ, নিউজলেটার, অটোমেশন
স্কুলের প্রশাসকভর্তির তথ্য, ফরম ডাউনলোড, নোটিশ, ফোন নম্বরদুই তিন পেজ, নিয়মিত হালনাগাদপেমেন্ট গেটওয়ে, শিক্ষার্থীর লগইন

চারটার মধ্যে মিলটা দেখুন। চারজনেরই সবচেয়ে বেশি দরকার একই তিনটা জিনিস: সঠিক তথ্য, একটা ফোন নম্বর যেটায় সত্যিই ফোন যায়, আর মোবাইলে পরিষ্কার দেখা। কারও কার্ট লাগছে না, কারও লগইন লাগছে না।

ফার্মেসির ঘরটা আলাদা করে খেয়াল করুন। সেখানে "যা দরকার নেই" ঘরে যেটা লেখা, সেটা কারিগরি লিমিট নয়, নিয়মের লিমিট। ওষুধ অনলাইনে বিক্রির ব্যাপারে আলাদা নিয়ম থাকে, তাই সাইট বানানোর আগে সেই দিকটা দেখে নেওয়া দরকার।

ডোমেইন, হোস্টিং আর DNS মানে কী

এই তিনটা শব্দ শুনে অনেকে ভয় পান, অথচ ব্যাপারটা দোকানের উদাহরণেই বোঝা যায়।

ডোমেইন হলো আপনার ঠিকানা, যেমন aiinbangla.com। এটা কেনা নয়, ভাড়া নেওয়া, প্রতি বছর নবায়ন করতে হয়। ভাড়া বন্ধ করলে ঠিকানাটা অন্য কেউ নিয়ে নিতে পারে।

হোস্টিং হলো দোকানঘরটা, যেখানে সাইটের ফাইল আর ছবি আসলে রাখা থাকে। কেউ আপনার ঠিকানায় এলে এই ঘর থেকেই জিনিস দেখানো হয়।

DNS হলো ঠিকানার বই। এটা ইন্টারনেটকে বলে দেয়, এই নামটা লিখলে কোন ঘরে যেতে হবে। ডোমেইন এক জায়গা থেকে আর হোস্টিং আরেক জায়গা থেকে নিলে DNS-এ একটা লাইন বসিয়ে দুটোকে জুড়তে হয়। কাজটা একবারের, কয়েক মিনিটের।

SSL বা HTTPS হলো ঠিকানার পাশের ওই তালার চিহ্ন। আগে এটা কিনতে হতো, এখন প্রায় সব ভালো হোস্টিংয়ে ফ্রি আর অটোমেটিক। কেউ আলাদা করে SSL-এর টাকা চাইলে প্রশ্ন করুন কেন।

মনে রাখার সহজ ছবি: ডোমেইন ভাড়া, ঘর ভাড়া, আর ঠিকানার বইয়ে নাম তোলা। তিনটা আলাদা জিনিস, আর তিনটা আলাদা জায়গা থেকে নেওয়া যায়। এক জায়গা থেকে সব নিলে সুবিধা, কিন্তু বাধ্যবাধকতা নেই।

ডোমেইন নিয়ে যে ভুলগুলো সবচেয়ে দামি

ডোমেইন সবচেয়ে সস্তা অংশ, অথচ এখানকার ভুলগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। চারটা জিনিস খেয়াল রাখুন।

এক, নিবন্ধন কার নামে। ডেভেলপার বা এজেন্সি আপনার হয়ে ডোমেইন কিনলে অনেক সময় সেটা তাদের নামেই নিবন্ধিত হয়। পরে সম্পর্ক খারাপ হলে ঠিকানাটা আপনার হাতছাড়া। করণীয়: নিজের ইমেইলে নিজের অ্যাকাউন্ট খুলে সেখান থেকে কিনুন, তারপর ইচ্ছে হলে অন্যকে সাইট বানাতে দিন।

দুই, নবায়নের তারিখ। ডোমেইন এক দিনের জন্যও মেয়াদ হারালে সাইট বন্ধ হয়ে যায়, আর কিছুদিন পর অন্য কেউ নিয়ে নিতে পারে। করণীয়: ফোনের ক্যালেন্ডারে মেয়াদের এক মাস আগে একটা রিমাইন্ডার, আর সম্ভব হলে অটোমেটিক নবায়ন চালু।

তিন, নাম বাছা। ছোট, বলা সহজ, বানান করা সহজ। ফোনে বলে বোঝাতে হবে ভেবে নাম বাছুন। হাইফেন আর সংখ্যা এড়িয়ে চলুন, মুখে বলতে গেলেই ঝামেলা হয়।

চার, কোন শেষাংশ নিবেন। বেশিরভাগ ছোট ব্যবসা .com নেন, কারণ সবাই ওটাই ধরে নেয়। দেশি শেষাংশের নিয়ম আর কাগজপত্র আলাদা হতে পারে, তাই নেওয়ার আগে নিবন্ধকের নিজের পেজে শর্তগুলো দেখে নিন।

Static সাইট মানে কী, আর ফর্ম কেন কাজ করে না

AI বিল্ডার দিয়ে বানানো বেশিরভাগ সাইট static, মানে সাইটটা শুধু দেখাতে পারে, কিছু জমা নিতে পারে না।

তুলনাটা এরকম: static সাইট হলো দেয়ালে টাঙানো একটা পোস্টার। সুন্দর, তথ্যপূর্ণ, সবাই পড়তে পারে। কিন্তু পোস্টারে কেউ নাম লিখে গেলে সেটা আপনার কাছে পৌঁছায় না, কারণ পোস্টারের পেছনে কোনো লোক বসা নেই।

তাই সাইটে একটা সুন্দর "যোগাযোগ ফর্ম" দেখা যাওয়া আর সেই ফর্মের তথ্য আপনার কাছে পৌঁছানো, এই দুটো এক জিনিস নয়। ফর্মের তথ্য কোথাও জমা হতে হলে পেছনে একটা সার্ভার লাগে, আর সার্ভার মানে খরচ।

যা চানstatic সাইটে হয় কিনা হলে কী লাগে
প্রোডাক্ট, দাম আর ছবি দেখানোহয়কিছু না
ফোন নম্বরে ট্যাপ করলে কল যাওয়াহয়কিছু না
WhatsApp বাটনহয়কিছু না
ম্যাপ আর ঠিকানাহয়কিছু না
ফর্মের তথ্য আপনার ইনবক্সে আসাহয় নাপেছনে একটা সার্ভার বা সার্ভিস
ভিজিটরের লগইন আর অ্যাকাউন্টহয় নাসার্ভার আর ডেটাবেস
কার্টে জমিয়ে অর্ডার দেওয়াহয় নাসার্ভার, স্টক ম্যানেজমেন্ট
অনলাইনে টাকা নেওয়াহয় নাগেটওয়ে, কাগজপত্র, অনুমোদন

ফর্ম ছাড়াও খবর পাওয়ার তিনটা ফ্রি পথ আছে, আর ছোট ব্যবসার জন্য এগুলো প্রায়ই যথেষ্ট:

  • WhatsApp বাটন, চাপলে সরাসরি আপনার নম্বরে মেসেজ খুলবে
  • সরাসরি ফোন নম্বর, মোবাইলে চাপলেই কল যায়
  • ইমেইল লিংক, বা কোনো ফ্রি ফর্ম সার্ভিস

আসলে বাংলাদেশে ছোট দোকানের বেশিরভাগ অর্ডার WhatsApp আর ফোনেই আসে। তাই ফর্মের পেছনে টাকা ঢালার আগে ভেবে দেখুন সত্যিই দরকার কি না।

আসল খরচ কত

এখানে সংখ্যাগুলো পরিষ্কার করে বলি, কারণ এই জায়গাতেই মানুষ সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্ত হন।

জিনিসকাজ কীসাধারণ খরচ
ডোমেইন (.com)সাইটের ঠিকানাবছরে ৳১,০০০ থেকে ৳১,৫০০
সাধারণ শেয়ার্ড হোস্টিংফাইল রাখার জায়গাবছরে ৳৩,০০০ থেকে ৳৬,০০০
SSL সার্টিফিকেটতালার চিহ্নসাধারণত ফ্রি
ফ্রি সাবডোমেইন লিংকঠিকানা কেনার আগে চালানোর পথফ্রি
ফর্ম সত্যিই কাজ করাঅর্ডার আর মেসেজ পাওয়াফ্রি সার্ভিসে সীমিত, নয়তো পেইড

দুটো কথা আলাদা করে খেয়াল করুন। প্রথমত, হোস্টিংয়ের খরচ প্রতি বছরের, একবারের নয়। পাঁচ বছর চালালে শুধু হোস্টিংয়েই ৳১৫,০০০ থেকে ৳৩০,০০০ চলে যায়। দ্বিতীয়ত, ডোমেইনের বাৎসরিক ভাড়া আলাদা, ওটা যেখান থেকে কিনেছেন তাদের প্রাপ্য, কোনো হোস্টিং কোম্পানি ওটা মাফ করতে পারে না।

আর ডেভেলপারকে দিয়ে বানানোর খরচ? কাজের পরিধির উপর এটা এত বেশি বদলায় যে একটা সংখ্যা বলা অসৎ হবে। তিন জায়গা থেকে লিখিত কোটেশন নিন, আর দেখে নিন তাতে ডোমেইন, হোস্টিং, পরে বদলানোর খরচ আর সোর্স ফাইলের মালিকানা কার, এগুলো স্পষ্ট করে লেখা আছে কি না। সবচেয়ে বড় খরচটা প্রায়ই প্রথম বিলে থাকে না, থাকে পরের প্রতিটা ছোট বদলের বিলে।

খুলনার দোকানের পাঁচ বছরের হিসাব

সংখ্যাগুলো একসাথে বসালে ছবিটা অন্যরকম দেখায়। খুলনার সেই হার্ডওয়্যার দোকানের কথাই ধরুন, একটা সাধারণ ক্যাটালগ সাইট।

ডোমেইন ধরুন বছরে ৳১,২০০। শেয়ার্ড হোস্টিং ধরুন বছরে ৳৪,৫০০। SSL ফ্রি। মানে বছরে ৳৫,৭০০, পাঁচ বছরে ৳২৮,৫০০।

এর সাথে যোগ হয় যেগুলো কেউ হিসাবে ধরে না। বছরে ধরুন চারবার দাম বা ছবি বদলাতে হয়। ডেভেলপারকে দিয়ে করালে প্রতিবার একটা বিল, আর অপেক্ষা। নিজে বদলাতে পারলে ওই খরচটা শূন্য, শুধু সময়। এই একটা পার্থক্যই পাঁচ বছরে হোস্টিংয়ের খরচের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়াতে পারে।

উল্টোদিকে হিসাবটা কী দাঁড়ায়? সাইটটা যদি বছরে মাত্র দশটা নতুন ক্রেতা আনে আর গড়ে প্রতি ক্রেতায় লাভ যদি ৳৬০০ হয়, তাহলে বছরে ৳৬,০০০, মানে খরচ প্রায় উঠে গেল। বিশটা আনলে লাভ। শূন্যটা আনলে পুরোটাই লোকসান।

আরও দুটো খরচ হিসাবের বাইরে থেকে যায়। এক, আপনার নিজের সময়। মাসে একবার হালনাগাদ মানে বছরে বারো বার বসা, প্রতিবার আধা ঘণ্টা করে ধরলেও ছয় ঘণ্টা। দুই, সাইট বন্ধ থাকার খরচ। নবায়ন ভুলে গিয়ে দুই সপ্তাহ সাইট বন্ধ থাকলে ওই সময়ের সব ফোন আর অর্ডার হারালেন, অথচ হোস্টিংয়ের বিলটা ঠিকই দিয়েছেন।

এই কারণেই পরের অংশের পরামর্শটা এত জরুরি: আগে জানুন সাইটটা কাজে লাগছে কি না, তারপর টাকা দিন। সংখ্যাগুলো আপনার হাতে থাকলে সিদ্ধান্তটা আন্দাজে নিতে হয় না, আর ছোট ব্যবসায় আন্দাজে নেওয়া সিদ্ধান্তই সবচেয়ে দামি পড়ে।

ফ্রিতে শুরু করার পথ

আমাদের পরামর্শ সবসময় একটাই: প্রথমে কিছু কিনবেন না।

বেশিরভাগ AI বিল্ডারে একটা ফ্রি সাবডোমেইন লিংক পাওয়া যায়; BanglaCodes-এ সেটা আপনার-নাম.banglacodes.app। ওই ঠিকানাটা ফেসবুক পেজের বায়োতে, WhatsApp-এর পরিচিতিতে আর ভিজিটিং কার্ডে দিয়ে দিন। এক মাস চালান।

এক মাস পরে দেখুন সাইটটা আদৌ কাজে লাগছে কি না, মানুষ ঢুকছে কি না, ফোন আসছে কি না। যদি লাগে, তখন নিজের ডোমেইন কিনুন। যদি না লাগে, এক টাকাও নষ্ট হলো না।

BanglaCodes-এ বাংলায় বলে সাইট বানানো আর ফ্রিতে প্রকাশ করে চালানো, দুটোই বিনা খরচে করা যায়; নিজের ডোমেইনে লাইফটাইম হোস্টিং একবারের ৳৬,৯৯৯, প্রতি বছরের নয়। তবে সৎভাবে বলা দরকার, ফ্রিতে প্রকাশ করা সাইটে ফর্ম ভরলে জমাটা কোথাও যায় না; ওই ৳৬,৯৯৯-এর হোস্টিংটা নিলেই ফর্ম কাজ করে আর অর্ডার সাইট ইনবক্সে বসে, দিনে ২৫টা সাবমিশন আর ৫টা email খবর পর্যন্ত। আর লেখা, দাম ও ছবি যেকোনো বিল্ডারেই আপনাকেই দিতে হবে।

যেসব প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করবেন না

  • "এক ক্লিকে সম্পূর্ণ ওয়েবসাইট", নকশা এক ক্লিকে হয়, কিন্তু আপনার দাম আর ছবি এক ক্লিকে আসে না
  • "AI দিয়ে Google-এ এক নম্বরে", র‍্যাংকিং সময়, বিষয়বস্তু আর বিশ্বাসযোগ্যতার ব্যাপার, কোনো টুলের প্রতিশ্রুতির ব্যাপার নয়
  • "সাইট বানালেই বিক্রি বাড়বে", সাইট একটা মাধ্যম, প্রচার আর প্রোডাক্ট ভালো না হলে সাইট কিছু বদলাবে না
  • "আজীবন ফ্রি হোস্টিং, কোনো শর্ত নেই", শর্ত পড়ুন, বিশেষ করে ট্রাফিকের লিমিট আর বিজ্ঞাপন বসানোর অধিকার নিয়ে
  • "ডোমেইন ফ্রি", প্রথম বছর ফ্রি হতে পারে, দ্বিতীয় বছর থেকে কত, সেটা আগেই জিজ্ঞেস করুন
  • "পরে যা বদলাতে চান, বলবেন", কতবার আর কত টাকায়, সেটা লিখিতভাবে জেনে নিন

বিল্ডারকে কী বললে ভালো সাইট আসে

AI বিল্ডারে ফল ভালো হবে না খারাপ, তার অর্ধেকটা ঠিক হয়ে যায় প্রথম ইনস্ট্রাকশনেই। বেশিরভাগ মানুষ খুব কম কথা লেখেন, তারপর ফল দেখে হতাশ হন।

নিয়মটা সহজ: কে আপনি, কার জন্য সাইট, ভিজিটর কী করবে, আর কী কী তথ্য অবশ্যই থাকবে, এই চারটা লিখে দিন।

যা মানুষ লেখেনযা লেখা উচিত
"একটা দোকানের ওয়েবসাইট বানাও""খুলনায় আমার হার্ডওয়্যার দোকান, নাম আর ঠিকানা এই। ক্রেতারা মিস্ত্রি আর বাড়ির মালিক। এক পেজের সাইট চাই, উপরে ফোন নম্বর আর WhatsApp বাটন, নিচে ২০টা প্রোডাক্টের ছবি আর দাম।"
"সুন্দর করো""লেখাগুলো বড় করো, ফোনে পড়তে সমস্যা হচ্ছে। রঙ নীল আর সাদা রাখো।"
"পোর্টফোলিও বানাও""আমি ঢাকার ডিজিটাল মার্কেটিং ফ্রিল্যান্সার। ছয়টা আগের কাজের নমুনা, তিনটা সার্ভিসের লিস্ট, আর নিচে ইমেইল আর WhatsApp।"
"মেনু যোগ করো""একটা টেবিল বসাও, তিনটা কলাম: প্রোডাক্টের নাম, মাপ, দাম। নিচের ২০টা সারি বসিয়ে দাও।"

ডান পাশের কথাগুলো লিখতে দুই মিনিট বেশি লাগে, আর তাতে দশ বার ঘুরিয়ে বলার ঝামেলা বাঁচে। আর খেয়াল করুন, ডান পাশের প্রতিটা বাক্যেই আসল তথ্য আছে, কাল্পনিক কিছু নেই। ওই তথ্যটুকু আপনার হাতে তৈরি না থাকলে কোনো ইনস্ট্রাকশনই কাজে আসবে না।

সাধারণ ভুল আর তার সমাধান

  • ভুল: লেখা আর ছবি জোগাড়ের আগে সাইট বানাতে বসা। ফল, কাল্পনিক লেখাসহ সুন্দর একটা অকেজো সাইট। সমাধান: আগে একটা ফাইলে সব লেখা আর ছবি জড়ো করুন
  • ভুল: ডোমেইন অন্যের নামে কেনা। সমাধান: নিজের ইমেইলে নিজের অ্যাকাউন্ট, তারপর যাকে খুশি কাজ দিন
  • ভুল: শুধু কম্পিউটারে দেখে সাইট প্রকাশ করা। সমাধান: অন্তত দুটো আলাদা ফোনে খুলে দেখুন, একটা পুরনো ফোনেও
  • ভুল: সাইটে দাম বসিয়ে ভুলে যাওয়া। পুরনো দাম দেখে ক্রেতা ফোন করেন, তারপর ঝগড়া। সমাধান: মাসে একবার হালনাগাদের দিন ঠিক করুন
  • ভুল: ফর্ম বসিয়ে ধরে নেওয়া যে মেসেজ আসছে। সমাধান: নিজে একবার ফর্ম পূরণ করে দেখুন সত্যিই কিছু আসে কি না
  • ভুল: সব পেজে ছবির মাপ বিশাল রাখা। মোবাইল ডেটায় সাইট খুলতেই চায় না। সমাধান: ছবি ছোট করে নিন, বিল্ডারকে বলুন হালকা রাখতে
  • ভুল: যোগাযোগের তথ্য পেজের একদম নিচে রাখা। সমাধান: ফোন নম্বর আর WhatsApp বাটন উপরেই রাখুন
  • ভুল: বাংলা ফন্ট ভেরিফাই না করা। যুক্তাক্ষর ভেঙে গেলে পুরো সাইট অপেশাদার দেখায়। সমাধান: কয়েকটা কঠিন শব্দ লিখে চোখে দেখে নিন

কখন ওয়েবসাইট বানাবেন না

সাইট সবার লাগে না, আর এটা বলা দরকার, কারণ অনেকে কেবল "সবার আছে বলে" বানাতে বসেন।

  • যখন লেখা, দাম আর ছবি এখনো তৈরি নয়। আগে ওগুলো, পরে সাইট
  • যখন আপনার ক্রেতারা পুরোপুরি ফেসবুক বা WhatsApp-এ আছেন আর সেখান দিয়েই সব চলছে
  • যখন প্রোডাক্ট বা সার্ভিস এখনো ঠিক হয়নি। সাইট বদলানো সহজ, কিন্তু বারবার বদলানো সময় খায়
  • যখন হালনাগাদ রাখার মতো কেউ নেই। পুরনো দাম দেখানো সাইট না থাকার চেয়েও খারাপ
  • যখন আপনি অনলাইনে টাকা নিতে চান কিন্তু কাগজপত্র নেই। আগে ট্রেড লাইসেন্স আর ব্যাংকের দিকটা গোছান
  • যখন উদ্দেশ্যটাই ঠিক নেই। "ভিজিটর এসে কী করবে" এক বাক্যে বলতে না পারলে সাইট বানিয়ে লাভ নেই

কাজের ক্রম

ভুল ক্রমে শুরু করলে সময় নষ্ট হয়। এই ক্রমটা কাজে দেয়:

  1. লেখা আর ছবি আগে। প্রোডাক্টের নাম, দাম, ফোন নম্বর, ঠিকানা, অন্তত দশটা পরিষ্কার ছবি
  2. সাইটের উদ্দেশ্য ঠিক করুন। এক বাক্যে লিখুন, ভিজিটর যেন কী করে
  3. ফ্রিতে প্রকাশ করে চালান। এক মাস
  4. ফোনে পরীক্ষা করুন। নিজের আর অন্তত একজন পরিচিতের ফোনে
  5. যোগাযোগের পথগুলো নিজে পরীক্ষা করুন। ফোন নম্বরে ট্যাপ করুন, WhatsApp বাটনে চাপুন, ফর্ম থাকলে পূরণ করে দেখুন
  6. লিংকটা সব জায়গায় বসান। ফেসবুক বায়ো, WhatsApp পরিচিতি, ভিজিটিং কার্ড, দোকানের সাইনবোর্ড
  7. এক মাস পর হিসাব করুন। কতজন ঢুকল, কয়টা ফোন এলো, কয়টা অর্ডার হলো
  8. কাজে লাগলে ডোমেইন কিনুন, নিজের নামে, আর তখনই কেবল হোস্টিংয়ের কথা ভাবুন
  9. প্রতি মাসে একবার হালনাগাদ করুন, আর নবায়নের তারিখটা ক্যালেন্ডারে বসিয়ে রাখুন

সাত নম্বর ধাপটা সবচেয়ে বেশি বাদ পড়ে, অথচ ওটাই সিদ্ধান্তের ভিত্তি।

শুরু করতে চাইলে ওয়েবসাইট বানানোর পেজ থেকে এক লাইনে লিখে পাঠান।

প্রশ্নোত্তর

কোডিং একেবারেই না জানলে সাইট বানানো যাবে? সাধারণ সাইটের ক্ষেত্রে যাবে। আপনি বাংলায় বললেই AI বানিয়ে দিবে, তারপর "ফোন নম্বরটা বড় করো" বলে বদলাতে পারবেন। কোড দেখার দরকার হবে না। জটিল কিছু, যেমন ইউজারের লগইন বা বড় ইনভেন্টরি, সেখানে মানুষের সাহায্য লাগবে।

AI-র বানানো সাইট কি Google-এ আসে? আসে, সাইট কে বানিয়েছে সেটা Google দেখে না। যা দেখে তা হলো সাইটে কাজের তথ্য আছে কি না, দ্রুত খোলে কি না, মোবাইলে ঠিক দেখায় কি না। ফাঁকা সাইট AI বানাক বা মানুষ, উপরে আসবে না।

ডোমেইন না কিনে চালানো যায়? যায়। ফ্রি সাবডোমেইন লিংক দিয়ে সব কাজই চলে। নিজের ডোমেইন মূলত পেশাদার চেহারার জন্য, আর ভিজিটিং কার্ডে ভালো দেখায় বলে।

সাইট বানানোর পর কি আর কিছু করতে হয়? হয়। দাম বদলালে সাইট বদলাতে হবে, ডোমেইনের নবায়নের তারিখ মনে রাখতে হবে, আর বছরে অন্তত দুবার ফোনে খুলে দেখতে হবে সব ঠিক আছে কি না। নবায়ন ভুলে যাওয়া সবচেয়ে সাধারণ দুর্ঘটনা।

অনলাইনে টাকা নেওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় কী? ছোট ব্যবসার জন্য সাধারণত নিজের bKash, নগদ বা রকেট নম্বর সাইটে দিয়ে রাখা, পার্সোনাল নম্বর হলেও চলে। ক্রেতা টাকা পাঠিয়ে TrxID লিখে অর্ডার দিবেন, আপনি নিজের অ্যাপে মিলিয়ে নিবেন। বিক্রি বাড়লে মার্চেন্ট নম্বর বা পুরোদস্তুর গেটওয়ে নিতে পারেন; গেটওয়ের জন্য কাগজপত্র আর অনুমোদন লাগে।

ফেসবুক পেজ থাকলে কি আলাদা সাইট লাগে? বাধ্যতামূলক নয়, তবে দুটোর কাজ আলাদা। পেজে মানুষ আসে খবর দেখতে, সাইটে আসে তথ্য খুঁজতে। সাইটের সুবিধা হলো পুরো লিস্ট এক জায়গায় গোছানো থাকে, লিংকটা ভিজিটিং কার্ডে দেওয়া যায়, আর পেজের নিয়ম বদলালেও সাইট আপনারই থাকে।

সাইট বানানোর পর কেউ ঢুকছে কি না বুঝব কিভাবে? বেশিরভাগ বিল্ডারে ভিজিটরের সংখ্যা দেখার ব্যবস্থা থাকে। না থাকলে সহজ উপায় হলো লিংকটা কোথায় কোথায় দিলেন সেটা লিখে রাখা আর ফোনে জিজ্ঞেস করা, "সাইটটা দেখেছেন?" ছোট ব্যবসায় এই সরাসরি প্রশ্নটাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।

সাইটে কতগুলো পেজ রাখব? বেশিরভাগ ছোট ব্যবসার জন্য এক পেজই যথেষ্ট, আর এক পেজ রাখলে হালনাগাদও সহজ হয়। পেজ বাড়ানোর দরকার হয় তখন, যখন আলাদা করে খোঁজার মতো আলাদা বিষয় জমে যায়, যেমন স্কুলের নোটিশ বা লম্বা ক্যাটালগ।

পুরনো সাইট আছে, নতুন করে বানাব না ঠিক করব? আগে দেখুন সমস্যাটা কোথায়। তথ্য পুরনো হলে বদলে নিন, নতুন সাইটের দরকার নেই। মোবাইলে ভেঙে যাচ্ছে, খুলতে দেরি হচ্ছে বা নিজে বদলাতে পারছেন না, এই তিনটার একটাও সত্যি হলে নতুন করে বানানোই সাধারণত সস্তা পড়ে।

সংক্ষেপে

  • কোডিং না জেনে ওয়েবসাইট বানানো এখন সত্যিই সম্ভব; কঠিন অংশটা কোড থেকে সরে গিয়ে হয়েছে আপনি কী চান তা পরিষ্কার করা আর আসল লেখা, দাম ও ছবি জোগাড় করা
  • ডোমেইন মানে ঠিকানা যা প্রতি বছর ভাড়া দিতে হয়, হোস্টিং মানে ফাইল রাখার ঘর, DNS মানে দুটোকে মেলানোর ঠিকানা বই, আর SSL এখন সাধারণত ফ্রি
  • ডোমেইনটা নিজের নামে নিজের অ্যাকাউন্টে কিনুন আর নবায়নের তারিখ ক্যালেন্ডারে রাখুন, কারণ সবচেয়ে দামি দুর্ঘটনাগুলো ঠিক এই দুই জায়গায় ঘটে
  • AI বিল্ডারের সাইট সাধারণত static, মানে দেখাতে পারে কিন্তু কিছু জমা নিতে পারে না; তাই ফর্ম দেখতে পাওয়া আর ফর্মের তথ্য আপনার কাছে পৌঁছানো এক জিনিস নয়
  • খরচের বাস্তব ছবি: ডোমেইন বছরে ৳১,০০০ থেকে ৳১,৫০০, সাধারণ শেয়ার্ড হোস্টিং বছরে ৳৩,০০০ থেকে ৳৬,০০০, অর্থাৎ পাঁচ বছরে শুধু হোস্টিংয়েই ৳১৫,০০০ থেকে ৳৩০,০০০
  • আগে ফ্রি সাবডোমেইন লিংকে এক মাস চালিয়ে দেখুন সাইটটা কাজে লাগছে কি না, তারপর ডোমেইন কিনুন; উল্টোটা করলে টাকা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি

বানানোর পরের কাজটা, মানে সাইটটা চালানো, ধাপে ধাপে লেখা আছে সাইট ম্যানেজ করার গাইডে।